যশোরের রাজনীতির তিন নক্ষত্রের শেষটিও ঝরে গেলো

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ তরিকুল ইসলাম, আলী রেজা রাজু ও খালেদুর রহমান টিটো। তিনজন ছিলেন বাল্যবন্ধু। তারা কখনো ছিলেন একই রাজনৈতিক দলের সহযোদ্ধা। কখনো ভিন্ন দলের বাসিন্দা। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই তিন বন্ধু যশোরকে নিয়েছেন উচ্চতায়। জেলা শহরের নানা পদে আসিন হওয়া ছাড়াও তারা তিনজনই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতৃত্বেও শীর্ষ কাতারেও ছিলেন তারা। এই তিন ব্যক্তির দুই জন তরিকুল ইসলাম ও আলী রেজা রাজু পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন আগেই। শেষজন খালেদুর রহমান টিটোও দুই বন্ধুর পথ ধরলেন। তিনিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। যশোরের রাজনীতিতে বটবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত এই তিন নক্ষত্রের চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে এক বিরাট অভিভাবকত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হলো

তরিকুল-টিটো-রাজু লেখাপড়া থেকে রাজনীতির মাঠে বেড়ে ওঠা একই সময়কালে। তিনজনই ছিলেন জনপ্রতিনিধি। যশোর পৌরসভার মেয়র হয়েছেন তিনজনই। তিনজনই হয়েছেন এমপি। রাজনৈতিক দলের জেলা শাখার তো বটেই কেন্দ্রের শীর্ষপদও তারা দখল করেছেন। দিয়েছেন সংকটে নেতৃত্ব। এই তিন বন্ধু রাজনীতি করতে গিয়ে কোনো কোনো সময় ছিলেন একই কক্ষপথে। আবার কখনো বা ভিন্ন মেরুতে। ভিন্ন শিবিরে অবস্থানকালে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর তার কোনো প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি। যশোর শহরের চৌরাস্তা মোড়ের অধুনালুপ্ত মধু সুইটস বা অন্য কোথাও একই টেবিলে চা পান করতে করতে ধুমছে আড্ডা দিয়েছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন একই রিকশায়। টাউন ক্লাবের তাসের টেবিলেও তাদের সহাবস্থান কারও চোখ এড়ায়নি।

একটা সময় এই তিন মহাতারকা যশোর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখনো সমাজ কলুষমুক্ত ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ একেবারে উবে যায়নি। রাজপথে মারপিট হয়েছে দুই দলের মধ্যে। কিন্তু দিনশেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত রাজনৈতিক দলের এই শীর্ষনেতাদের খোশগল্প করতে দেখেছেন কর্মীরা। তাদের আদর্শ নিয়ে এখনো চায়ের দোকানে কর্মীদের আলাপ করতে শোনা যায়। আগে জীবিত এক বন্ধুর সাথে যুক্ত করে মৃত দুই বন্ধুর কর্মযজ্ঞ নিয়ে যশোরবাসী প্রশংসা করতেন। এখন তিনজনই প্রয়াত হয়েছেন। এখন আলোচনা করবেন প্রয়াত তিনজনকে নিয়ে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও যশোর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খালেদুর রহমান টিটো রোববার দুপুর ১টা ১৯ মিনিটে মারা গেলেন যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ৭৫ বছর বয়সে। তিনি বেশকিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। আর তরিকুল ইসলাম মারা যান তার দুই বছর আগে। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর। আরেক বন্ধু আলী রেজা রাজু মারা যান ৭১ বছর বয়সে। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই। তিন বন্ধুর মধ্যে টিটোই অন্য দুই বন্ধুর চেয়ে বেশি দিন বেঁচে ছিলেন। ফলে দুই বন্ধুর মৃত্যু তাকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। বন্ধু তরিকুল ইসলামের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি কেঁদেছিলেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন ‘যশোরবাসী বুঝতে পারবে তারা কী হারালো’।

অন্যদিকে, আলী রেজা রাজু যেদিন মারা যান তার কিছুসময় আগে তরিকুল ইসলাম সপরিবারে ঢাকা গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হননি তরিকুল। বন্ধু রাজুর মৃত্যুসংবাদে বিকেলের ফ্লাইটেই যশোর ফিরেছিলেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে সোজা গিয়েছিলেন রাজুর ঘোপের বাড়িতে। সেখানে মরদেহের পাশে দীর্ঘসময় অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন। শত-সহস্র লোক তরিকুলের সেই ক্রন্দনদৃশ্য দেখেছিলেন। তিন নক্ষত্রের বিদায়ের এমন আবেগঘন মুহূর্ত স্মৃতি হয়ে রয়েছে তরুণ রাজনীতিকদের কাছে।

শেয়ার