স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতু

বৃহস্পতিবার ৪১ তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাস্তবে প্রস্ফুটিত হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এখন পদ্মার এপার ওপারের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সংযোগ সম্পন্ন হলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে পরিপূর্ণভাবে চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু উন্মুক্ত করতে হলে চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে সবগুলো স্প্যান বসানো অত্যাবশ্যক ছিল।

ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই সেতুর মূল কাঠামো বসানোর কাজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ায় এখন দেশবাসী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থাৎ ২০২১ সালের বিজয়ের মাসেই নিশ্চিতরূপেই সার্বিক চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু উপযুক্ত ও উন্মুক্ত হবে। স্বপ্নপূরণের দ্বারপ্রান্তে দেশের মানুষকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথম কৃতিত্ব দিতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই। তার আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদাবোধই এমন একটি দুরূহ ব্যয়বহুল নির্মাণের স্বপ্নকে সফল করে তুলেছে। এই সেতু নিয়ে দেশে ও বিদেশে কম চক্রান্ত হয়নি। অর্থায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকও অপবাদ দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যার অবিচল দৃঢ়তায় স্বপ্ন সফল হলো। সমগ্র দেশবাসীর ধন্যবাদ পাবেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রকৃতিও কখনও কখনও বৈরী ছিল বটে। বন্যা, তীব্র স্রোত এবং করোনাভাইরাস- স্বপ্নপূরণের গতি শ্লথ করেছে কখনও কখনও। কতিপয় খ্যাতিমান ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এমন সব কথা ছড়িয়েছে যাতে মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরে। এ দেশে জন্মগ্রহণ করে এদেশেরই বিরাট অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো এবং অশুভ কামনা কিভাবে সম্ভব! সব বাধা তুচ্ছ করে আজ যে একথা আবারও প্রমাণিত হলো- বাংলার মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। বিশ্বও আজ অবাক তাকিয়ে রয়। বলতে দ্বিধা নেই অবহেলিত জনপদ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শুধু নয়, গোটা বাংলাদেশের জন্য আজ এক ঐতিহাসিক দিন। দেশের জন্য এক মহাগৌরবের দিন এটি। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২৯টি জেলার মানুষের চলাচলের জন্যে বিশাল সুবিধা হবে আগামী ডিসেম্বরে সেতু উন্মুক্ত হলে। এখন প্রমত্তা পদ্মার বুকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে প্রায় সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি। সেতুর স্টিলের অবকাঠামো পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের মনে স্বপ্নের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আমরা জানি এরপর সেতুর এই অবকাঠামোর ওপর বসবে সড়ক স্ল্যাব, আর নিচে বসবে রেলওয়ে স্ল্যাব। সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। সুদীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষে সামনেই সেই শুভ দিন। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা যেতে লাগবে এক ঘণ্টা, অর্থাৎ চার ঘণ্টার পথ মাত্র এক ঘণ্টায় পাড়ি দেবে মানুষ।

পদ্মা সেতু হলো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতার প্রতীক। এই সুবর্ণ সময়ে আমরা পেছনের দিকে তাকালে দেখি একের পর এক নাটক মঞ্চায়নের ব্যর্থ প্রয়াস। সেতুর ২৯০ কোটি ডলারের প্রথম বাজেটের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছিল; কিন্তু ২০১২ সালে হঠাৎ করেই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে প্রকল্প থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়ে দেন যে কারও অর্থে নয়, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থেই আমরা পদ্মা সেতু করব। তাতেও ষড়যন্ত্র থামেনি। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু বানাতে গেলে নাকি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শেষ হয়ে যাবে। আমদানি বন্ধ হয়ে যাবে। দেশ মহাসঙ্কটে পড়বে। কিছুই হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েক গুণ বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

পদ্মায় কেবল সেতুই নির্মিত হচ্ছে না, একই সঙ্গে রচিত হতে যাচ্ছে এক থেকে দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়ার এবং দারিদ্র্যের হার দশমিক ৮৪ শতাংশ কমিয়ে আনার সুন্দরতম স্বপ্ন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে আনার সম্পূর্ণ সুফল গোলায় তুললে উন্নয়নের পালে যে হাওয়া লাগবে, তাতে একবিন্দুও সংশয় নেই। তলাবিহীন ঝুড়ির বদনাম কত শুনেছে দুখিনী জননী, আজ কারও দুঃসাহসই হবে না তাকে অসম্মান জানানোর। বিশ্ব দেখলো বিজয়ের মাসে আমাদের আরেক বিজয়। শাবাশ বাংলাদেশ।

 

শেয়ার