সাহিত্যবিশারদ ও তার অভিভাষণ

সাহিত্যবিশারদ ও তার অভিভাষণনাসিমা হক মুক্তা
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি কঙ্কালের ব্যবসায়ী। পুরাতন পুথি কঙ্কালেরই মতো।’ তার নামের সঙ্গে ‘সাহিত্যবিশারদ’ একটি গুণবাচক শব্দমাত্র। আমাদের কাছে যা অতুলনীয় ঐতিহ্যের মতো। অথচ হাজারও গুণে গুনান্বিতকে এই একটি শব্দের গ-িতে বাঁধা যায় না। তিনি আমৃত্যু সাহিত্যে নিবিষ্ট হয়ে জ্ঞান-অন্বেষণ করে গেছেন, আমাদের জন্য রেখে গেছেন অনেক। সাহিত্যবিশারদের সাহিত্য ও ঐতিহ্য নিয়ে মূলত দুটি ধারা দেখা যায়- অনুসন্ধান, গবেষণা। একাজে ঐতিহ্যানুরাগ তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ও সে সময়ের সাহিত্যিকদের অক্লান্ত সাহিত্যসাধনা ও চর্চায় অন্যতম ছিল পুথি। সেই পুথি সংগ্রহে আবদুল করিম উদ্বুদ্ধ হন। তবে নিছক পুঁথিসংগ্রাহক বা তার সম্পাদক হয়ে দিন পার করেননি এই সাহিত্যবিশারদ। তিনি পুরো বাঙালি, তার ভাষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ইতিহাসে এমন স্থান করে নিয়েছেন যে, সে স্থান এখন একান্তই তার নিজের। অন্য কেউ সাহস করে সেখানে তাকাতেও ভয় পায়। তাকে কেউ পুথিকুবের, কেউ যুগপুরুষ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। আমি নগণ্য পাঠক। তাকে নিয়ে লেখার ধৃষ্টতা মার্জনার চোখেই পড়বেন বলে প্রত্যাশা।

আমি আজ এই লেখায় এই সাহিত্যবিশারদের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য ও তার মন্তব্য তুলে ধরবো। যেমন- মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য বলেছেন, ‘ঐতিহ্য বিভেদের চামুন্ডা নয়।’ ঐতিহ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি ধ্রুব উজ্জ্বল শিখা। ঐতিহ্যের অনুসরণ ও সেই স্রোতধারাকে চিরপ্রবাহমান করিয়া তোলাই সংস্কৃতিসেবীর আসল কাজ। যাহারা তাহা মানে না, তাহাদের কাছে আমার সাধনার কোন মূল্য নাই! তাহাদের সহিত আমি তর্কে প্রবৃত্ত হইব না। কিন্তু আপনাদের বলিতে চাই, ঐতিহ্যের পটভূমির সহিত যাহাদের যোগ নাই,তরুলতার ক্ষেত্রে যেমন পরভোজী শব্দ ব্যবহার করা হয় – এখানে ওই জাতীয় ব্যক্তিদের জন্য তেমন বিশেষণ-ই আরোপ করা চলে। সমাজজীবনেও দেখিবেন, ইহারা পরভোজী। মানবতার সহিত তাঁহাদের কোন সম্বদ্ধ নাই। জনসাধারণের মস্তকে কাঁঠাল ভাঙিয়া দিনাতিপাত করেন। এ জাতীয় ব্যক্তিদের উপদেশ কোনদিন গ্রহণ করিবেন না।’ সাহিত্যবিশারদ এতোটাই উদার ও সৎ ছিলেন প্রতিটি কাজে বিশ্লেষণ মনুষ্যত্ব বিচারবোধ ব্যবহার করতেন।

সাহিত্যের প্রধান উপকরণ মানুষ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এর ভেতর যারা প্রবেশ করতে পারবেন তারাই একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দরজা খুলে দেন সবার জন্য। আবদুল করিম আজীবন সাহিত্যকে সন্তানের চেয়েও বেশি ভাবতেন। তাই হিন্দুজ্ঞানী ও গুণী পন্ডিতরা যেদিন বলেছিলেন মুসলিমদের পরিচয় কী? তাদের সাহিত্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চট্টগ্রামের অঘাটে, অচেনা প্রত্যন্ত প্রদেশ অজদাগড় ও গন্ডগ্রাম থেকে তিনি পুঁথি সংগ্রহ করেছেন এবং তার ওপর প্রবন্ধও লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে আলাওল, মাগনঠাকুর, দৌলত উজির, দৌলত কাজীসহ অনেক প্রাচীন লেখকের সাথে তার পরিচয় হয়। তাই তিনি বলেন, ‘যে জাতির ঐতিহ্য নেই, তাঁর কিছুই নেই।’

মুনসী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ। স্বদেশ-সংস্কৃতি-মাতৃভাষা ভিত্তিক বির্তক ও জাতীয় সংকট নিয়ে ১৯০৩ সালে মতামত পেশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালা ভাষা ত্যাগ করিলে বঙ্গীয় মুসলমানের কোন মঙ্গল আছে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস নাই। যদি কখনো অধঃপতিত বাঙ্গালীর উদ্বোধন হয়, তবে বাঙ্গালার অমৃতনিষ্যন্দিনী বাণী ও অনলগর্ভা ও উদ্দীপনাতেই হইবে’ [নবনূর, আষাঢ় ১৩১০]।

মুনসী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর জন্ম ও জীবন পরিসরে স্বদেশ, স্বকাল ও স্বসমাজ প্রতিবেশ সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা অন্তত জরুরী। তিনি ১৯১৮ মাতৃভাষা বাংলা সম্পর্কে সেকাল ও একাল যুগের ব্যতিক্রমী যা চিন্তা করেছেন, সে সূত্র ধরে বলেছেন, ‘বাঙ্গালা ভাষা ভিন্ন অন্য কোন ভাষা বাঙ্গালি মুসলমানের মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা হইতে পারে না। চিরকাল মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা বলিয়া স্বীকৃত ও গৃহীত দেশভাষার স্থলে নূতন ভাষার আমদানি হইলে তাহা পরিণামে সমাজের পক্ষে কেবল মারাত্মক হইবে মাত্র। বরং একবারে অচল ও পুঙ্গ হইয়া পড়িবে।’ [আল- এসলাম, ১৩২৫]।

সাহিত্যবিশারদ পাঠ মহাসমুদ্রে অবগাহনের মতোই অসাধ্য বিষয়। তাঁকে নিয়ে যারা গবেষণা তা খন্ডমাত্র। সম্পাদিত কাব্য, পুঁথি বিবরণী এবং প্রবদ্ধ ছাড়াও তাঁর দুটি পুস্তক তাঁর নাম বহন করে। এর একটি ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য (১৯৩৫), অপরটি ‘ইসলামাবাদ’। ইসলামাবাদ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যু পর। এই নিয়ে সাহিত্যবিশারদ ও ড. এনামুল হকের মধ্যে একটু গোলযোগ আছে। এ ব্যাপারে কবি আবদুল কাদির বলেন, ‘চট্টগ্রাম অভিভাষণে ( চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মিলনী, ১৩৪০) তিনি ( সাহিত্যবিশারদ) বলেন যে, “বাঙ্গালার মুসলিম সাহিত্যের ইতিহাসে খ্রীষ্ট সপ্তদশ শতাব্দী একটি স্বর্ণময় যুগ। ১৩৫২ সালে কুমিল্লা সাহিত্যবিশারদ সম্মেলনে বলেন, ‘ আমার এই বিশ্বাস আছে যে, আমার দেশের মৃত্যু নাই ; আমার দেশের আত্মা যে জনগণ, তাহারও মৃত্যু নাই; তেমনই অমর আমার এই বাঙ্গালা ভাষা।’ [ দিলরুবা, ভাদ্র ১৩৫৯]

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ একজন সংস্কারমুক্ত মানববাদী, উদার বোধের প্রেরণা থেকে প্রাচীন ও মধ্য যুগের হলেও মননে-সৃজনে আধুনিক ছিলেন। দেশ, মানুষ ও মনুষ্যত্ব কে যে নিবর্ণ মানুষ হিসেবেই দেখেছিলেন তা তাঁর প্রমাণ একমাত্র ১৯৫২ সনে প্রেরিত কুমিল্লা ভাষণ। দেশের মাটি, মানুষ ও সাহিত্যকে ভালোবেসে কেরানির খাটুনি পরও দুষ্পাপ্য পুঁথি সংগ্রহে বের হয়ে যেতেন। কবি জীবেন্দ্র কুমারকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘বিষয় কর্মে আমার আগ্রহ নেই, এই কর্ম চাচার হাতে দিয়ে আমি নিশ্চিন্তে মনে সাহিত্যসেবা নিয়েই আছি।’ অন্য আরেক অভিভাষণে তিনি বলেছেন, ‘দেশের মানুষ, পাশের বাড়ির লোক কী কীর্তি রেখে গেছেন তা যদি না জানলাম তা হলে আরব-ইরানি ভাইয়ের কীর্তির খবর নিয়ে কী লাভ?’

১৯৪৭ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২০ জন বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধি ও সাংবাদিক পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে যে স্মারকলিপি পেশ করেন, তাতে প্রথম স্বাক্ষর দেন সাহিত্যবিশারদ। ১৩৪৬ সালে (কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে) সাংস্কৃতিক সামপ্রদায়িকতা ও সাহিত্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বক্তব্যে বলেন, ‘সাহিত্যে জাতিধর্মের গন্ডি আমি কখনো স্বীকার করি নাই, এখনো করি না। কিন্তু ইহার বৈচিত্র্য স্বীকার করি। সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান যে জাতিরই হউক, ইহা সাহিত্য পদবাচ্য হইলেই সার্বজনীন হইয়া থাকে।’ আবার চট্টগ্রাম সংস্কৃতি সম্মেলনের মূল সভাপতির ভাষণে (১৬ মার্চ, ১৯৫১) বলেন, ‘ঐতিহ্যের সহিত দেশের ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা, লৌকিক আচার, বায়ু, গাছপালা, এমনকি তরুলতা পর্যন্ত জড়িত। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক অতি নিবিড়।’ সংস্কৃতির শেকড় যে ঐতিহ্যের জমিনের গভীর প্রোথিত, আমাদের অস্তিত্বের প্রেরণাও যে সেখানেই নিহিতÑ জীবনসায়াহ্নে গভীর প্রত্যয় সেকথা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, সংস্কৃতির জন্ম-প্রেরণা যেখানে হইতেই ইউক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রকাশ পরিবেশ নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার অর্থ ভিত্তিকে অস্বীকার করা। মাটি ভিত্তি করিয়া তাজমহল দাঁড়াইয়া আছে। সেই মাটির গুরুত্ব অনেকখানি। ইহা ছাড়া তাজমহল তৈরি সম্ভব ছিল না। তেমনি ঐতিহ্য সম্পর্কবিহীন সংস্কৃতি-সাধনাও অসম্ভব। ঐতিহ্যের যাহা কিছু ভাল তাহার অনুসরণ এবং যাহা কিছু নিন্দনীয়, উহার বর্জনেই নূতন জীবনাদর্শের সন্ধান মিলে। সংস্কৃতির রূপান্তরও এইভাবেই ঘটে, অগ্রগতিও আসে এই পথে।’ [কুমিল্লা পূর্ব- পাক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণ, ২২ আগষ্ট ১৯৫২]।

মুনসী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারকে বাঙালিদের বেশি চর্চা করা উচিত। উনাকে জানা মানেই নিজেকে সমৃদ্ধ করা। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার সুচক্রদন্ডী গ্রামে তাঁর পৈত্রিক বাড়ী। গুণী এই মানুষের জন্ম ১১ অক্টোবর ১৮৭১, মৃত্যু ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ সালে। দুমাস আগে তাঁর ১৪৮তম জন্মদিন গেল। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আগেই বলেছিÑ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে পুরোপুরি তুলে অসম্ভব। আমিও সামান্যই পেরেছি। এই সামান্য প্রচেষ্টায় ছিল তার কিছু অভিভাষণ পাঠকের কাছে নেওয়া। ভুলত্রুটি ধরিয়ে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলেই প্রত্যাশা।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক

শেয়ার