প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়ে (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েচন্দ্রশিলা ছন্দা
বেলা গড়িয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেলো সাজেকে। বারোটার কাছাকাছি। সময়টা এখনো মনের কোণায় খোঁচা দিয়ে ওঠে। সাজেকের পথে পথে চোখে মাখা সৌন্দর্য তখন একটু সময়ের জন্য ঝাপসা হয়ে ওঠে। না দেখে বুক করা হোটেল এর জন্য দায়ী। যদিও অচেনা-অজানায় ঘুরতে বের হলে দেখে তো আর হোটেল বুক করা সম্ভব না। যে রুমে আমরা, তার জানালার স্ক্রিন মেঘ দেখায় না, দেখায় আমাদের মতো অনেকের ভ্রমণ-অসতর্কতা। তুলে ধরে প্রকৃতি দেখতে এসে পরিবেশ নষ্ট করে রাখার সব করুন চিত্র, মাটির প্রতি নিদারুন অত্যাচারের ইতিহাস। জানালা খুলতেই নোংরা প্লাস্টিকের বোতলে ভরে ওঠা আর চিপসের প্যাকেটে ঢেকে থাকা পাহাড়িভূমি চিৎকার দিয়ে ওঠে যেনো।

পাহাড়ের ঢালে হওয়ায় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আমার রুম। জানালা খুলে বুনো গাছ বা ফুলের বাগান দেখার সাথে উঁকি দিয়ে থাকা আকাশ দেখার স্বাদ কোনমতেই পিছু ছাড়ছিল না। খুঁজতে শুরু করলাম। পেয়ে গেলাম হোটেল টারেং। টারেং মানে হলো পাহাড়ের ঢাল। তখনো হোটেলের কাজ চলছে। কেবল একটি-দুটি রুম তুলছে। ভাড়া কম না হলেও মনের খোড়াক জোগায়। ছয় হাজার টাকায় প্রতিরাত কেনা যায় এখানে। কাঠের হোটেলটি প্রথমের মন্দলাগা কিছুটা ভালো করে দিলো। এখান থেকে সাজেকের ভিউ চমৎকার!

ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঢাকার কোলাহল ছেড়ে জার্নির ওপর আছি। টারেংয়ের পরিবেশে খাওয়া-দাওয়া শেষে করে কিছুক্ষণ রুমেই কাটালাম। চমৎকার লবি আর ঝুল বারান্দা থেকে সূর্যাস্ত দেখছি। পাহাড়ের আড়ালে সূর্য চলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে নতুন ছবিতে রূপ নিচ্ছে প্রকৃতি। পাহাড়ি সবুজ প্রান্তরে অস্তগামী সূর্যের রঙোচ্ছটার বর্ণনা করার মত শব্দ বা উপমা আমার ভান্ডারে নেই। এ ছবি শুধু দুচোখ ভরে দেখার।

কয়েক ধাপে অস্ত গেলো সূর্য। সত্যি অবাক করা। বারবার রঙ বদলানো এই দৃশ্য আমাদেরকে ম্যাজিক দেখাতে থাকলো। আমরা তখন খুবই উৎফুল্ল।

ধীরে ধীরে পাহাড় জুড়ে আঁধার নেমে এলো। আকাশ জুড়ে দেখা দিলো উঠেলো হাজার তারার বাগান। অতুলনীয় সে রূপতায় অভাবনীয় শব্দের সাথে পরিচিত হলাম। বিচিত্র পাখির ডাকে অভিভূত হলামÑ কেউ যেনো হঠাৎ হেসে উঠছে। মায়াবীনি সে রাত চোখ ছুঁয়ে আছে আজও।

সূর্যোদোয় দেখবো বলে রাত পাঁচটার সময় ছুটে গেলাম সাজেকের হেলিপ্যাডে। অভূতপূর্ব মুহূর্ত। প্রতিটি সেকেন্ড আমরা গুনছি আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে সুবেহ-সাদিকের প্রলেপে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হলদেটে লাল আভায় চারদিক জেগে উঠছে। সূর্য মহারাজ হাসিয়ে তুলছেন প্রকৃতি। ঘুম ভেঙে ফের চোখ জুড়ানো সাজে জেগে উঠছে পরিবেশ, তার গাছগাছালি, ভিজে থাকা পাহাড়, মাটি। এভাবে জাগিয়ে ফের লুকিয়ে পড়ছেন সূর্যরাজ। সকালটা তার লুকোচুরির দুষ্টুমিতে ভরে উঠলো। সবার হাতের মোবাইল আর ক্যামেরা জেগে উঠলো একসাথে। আমার চোখের ক্যামেরা তখন দারুণ সচল নতুন নতুন দৃশ্যধারণে। এক সময় চোখের ক্যামেরার পাশাপাশি কৃত্রিম ক্যামেরায় স্মৃতি ধরে রাখতে আমিও লেগে পড়লাম। শত শত ছবি তুলেও যেনো অতৃপ্তি থেকেই যাচ্ছিল।

পাহাড়ের রাত শীতের চাদরে ঢাকা। তার ওপর আমরা গিয়েছি শীতের আগমনীবার্তা নিয়ে। সব মিলিয়ে হিমেল হাওয়ার দৌড়াদৌড়ি অন্যরকম স্বাদ এনে দিচ্ছিলো। আগে বুঝতে না পারায় অনেকে গরম পোশাক সাথে করে আনেনি। হোটেলের কম্বল গায়ে জড়িয়েই সকালে টুথব্রাশ নিয়ে ছুটাছুটি করছেন তারা। শীতের পোশাক আর টুপিতে গা-মাথা ঢেকে অনেকটা কাঁপতে কাঁপতে সারলাম সব কাজ।

এক-দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর পুব আকাশ, আঁকাবাঁকা পাহাড়ের ঢেউ কেউ যেন সোনা গলিয়ে মেখে দিলো! সূর্যরাজ যেন ধরণী মাতার কোলে আসার আগে মাকে সোনালি পাড়ের শাড়ি পরিয়ে দিলেন। রোদের ঝিলিকে চিলিক দিয়ে উঠলো হৃদয়-মন। মনে মনে গেয়ে উঠলাম, ‘সার্থক জনম আমার, জন্মেছি এই দেশে…’।

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েসমুদ্র আমাকে ভীষণরকম টানে। তবে আকাঙ্খা ছিল মেঘের সমুদ্রস্নানে ডুব দেয়ার। ছোটবেলায় নদীর উঁচু পাড়ে এক পা সামনে, আরেক পা পেছনে দিয়ে পজিশন নিয়ে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর বলে ঝাঁপ দিতাম নদীতে। সাজেকে সকালের সূর্যোদয়ের পর চোখের সামনে মেঘের ওই ফেনিল সমুদ্র দেখে আমার তেমন করে ঝাপ দিতে মন চাইলো। মনে হচ্ছিল, মহাশক্তি আমার কানে বাতাসে বার্তা পাঠিয়ে বলেছেনÑ আমি আকাশ এবং সমুদ্রকে নয়নাভিরাম করে সৃষ্টি করেছি। জমিনে এবং আকাশে স্থাপন করেছি ফেনিল সমুদ্র। তোমরা কি তা দেখো না?

লেখক: কবি, গল্পকার

শেয়ার