অভিনন্দন ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’

পলি শাহীনা
‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’। লেখকদের অনুপ্রেরণামূলক একটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। ভীষণ সাধনার বিষয় লেখালেখিকে স্পন্দিত করে রাখতে সর্বদা সচেষ্ট। বিদেশবিভূঁইয়ে বাংলা শব্দের প্রতি নিবিড় সাধনা জাগ্রত করে রাখতে যার অবদান অনেক।

নিবিড় সাধনা ছাড়া ভাবনা-অনুভূতি-জীবনবোধ, এই সুক্ষ্ম বিষয়গুলো কলমের ডগায় শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের শহর নিউইয়র্ক, যে শহরের ভাষা-সংস্কৃতি-জীবনবোধ সম্পূর্ণ আলাদা। এ ব্যয়বহুল শহরে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে মানুষকে সার্বক্ষণিকভাবে ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে পথ চলতে হয়। এ যান্ত্রিক শহরে স্বদেশীয় ভাষায় সাহিত্য চর্চা কিংবা সাহিত্য সাধনা করা খুব কঠিন এবং ত্যাগের বিষয়। লেখকদের সাহিত্য সাধনায় মগ্ন রাখার নিমিত্তে ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’র নিয়মিত আসর শব্দসাধকদের উৎসাহ যোগায়।

গত দশ বছর ধরে মাসের শেষ শুক্রবার নিয়মিতভাবে সাহিত্য একাডেমির আসরগুলো অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারির কবলে পড়ে গত মার্চ মাস থেকে সাহিত্য একাডেমির নিয়মিত আসর বন্ধ রয়েছে। বিপন্ন সময়ের কবলে পড়ে সাহিত্য একাডেমির আসর বন্ধ থাকলেও, প্রবাহমান সময়ের হাত ধরে এসেছিল ২৭ নভেম্বর; সাহিত্য একাডেমির দশম বর্ষপূর্তির দিন। গৌরবান্বিত দশম বর্ষপূর্তিতে সাহিত্য একাডেমিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই!

আমরা ইতিবাচক গল্প শুনতে পছন্দ করি। লেখক এবং সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’ – একটি ইতিবাচক গল্পের নাম। প্রবাসের ব্যস্ত জীবন যাপনের মধ্যে দশ বছর ধরে অবিরত ভাবে সাহিত্য একাডেমির আসর করে যাওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়! এ বিষয়টি বাংলা ভাষা-ভাষীদের জন্য শুধু বিস্ময়ের নয়, গর্বেরও বটে। মাসের শেষ শুক্রবার সাহিত্য একাডেমির ঘরটিতে যেন পরবাসী লেখকদের চাঁদের হাঁট বসে। মাসের শেষ শুক্রবার সাহিত্য একাডেমিতে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফুল হয়ে ফোটে। দেশের বাইরে থেকেও লেখকরা দেশকে ভুলে যাননি। মাসের শেষ শুক্রবার লেখকদের কবিতা-গল্প-ছড়ায় আমাদের প্রিয় বর্ণমালা গোলাপ পাপড়ির মত ঝরে ঝরে পড়ে। যে পাপড়ির গন্ধ শুঁকে শুঁকে সংবেদনশীল হৃদয় ছুটে যায় জননী এবং জননী সম জন্মভূমির বুকে। শেকড়ের ঘ্রাণ নেন প্রাণভরে। মাসের শেষ শুক্রবার লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মস্তিষ্কের সমস্ত অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা।

প্রায় আড়াইশ বছর আগে উন্নতমানের আড্ডা হতো গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে। জিমনেসিয়াম ছিল তাঁদের আড্ডার আখড়া। এথেন্সবাসী একই জায়গায় শরীর ও মনের চর্চা করতো। ওসব আড্ডায় আসর জমিয়ে রাখতেন সক্রেটিস, প্লেটোর মত গুণীজনেরা। তাঁদের আড্ডা থেকেই সৃষ্টি হতো অনেক উন্নতমানের শিল্প সাহিত্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানের তত্ত্ব কথা। সাহিত্য একাডেমি লেখকদের জন্য একটি বড় মঞ্চ। ঝড়, বৃষ্টি, তুষারপাত প্রকৃতিতে যাই হোক না কেন, গত দশ বছর ধরে মাসের শেষ শুক্রবার নিউইয়র্ক শহরের লেখকরা সাহিত্যের আলোচনা, গল্প, কবিতা, আড্ডায় নিয়মিত ভাবে মুখোর করে রেখেছেন সাহিত্য একাডেমির ঘরটিকে। সাহিত্য একাডেমিতে আগত দেশ- প্রবাসের অনেক গুণীজনেরাই আশা ব্যক্ত করে বলেছেন, হয়ত অদূর ভবিষ্যতে কোন একদিন সাহিত্য একাডেমির এই ঘর হতেই বেরিয়ে আসবে বাংলা সাহিত্যের কোন উজ্জ্বল নক্ষত্র! অমর একুশের গ্রন্থমেলায় সাহিত্য একাডেমির লেখকদের নতুন বই বের হচ্ছে! সাহিত্য একাডেমিকে ঘিরে লেখকদের মধ্যে উৎসাহ, উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা কাজ করে। লেখকদেরকে এক জায়গায় সংগঠিত করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। সাহিত্য একাডেমি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে অনেক কাঠ, খড় পুড়িয়ে ভালোবাসা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠার সাথে কাজটি করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। সাহিত্য একাডেমি ছাড়া নিউইয়র্ক শহরে লেখকদের জন্য নিয়মিত চর্চার তেমন উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্য সংগঠন নেই। সাহিত্য একাডেমি নতুন লেখকদের যতœ নেয়। তাঁদের প্রস্ফুটিত হতে সাহায্য করে। সাহিত্য একাডেমির ছায়াতলে প্রবীণ কবি, লেখকদের কাছ থেকে লেখালেখি বিষয়ে উপদেশ ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে নবীন কবি, লেখকরা নিজেদেরকে শানিত করার সুযোগ পান। লেখকদের প্রাথমিক স্তর গঠনে সাহিত্য একাডেমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রবাসের গতানুগতিক কর্মময় জীবন যাপন ও বাস্তব, নিষ্ঠুর, নির্দয় বাস্তবতার সাথে পাল্লা দিয়ে নিজ দেশীয় ভাষায় সাহিত্য চর্চায় কঠিন পরিশ্রম করছে সাহিত্য একাডেমি। নতুন প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখে সাহিত্য একাডেমি। এদেশে জন্মগ্রহণকারী আমাদের সন্তানেরা নিউইয়র্কের মূল ধারায় চলে গেলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে যেন দূরে সরে না যায় সেজন্য সাহিত্য একাডেমি চেষ্টা করে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, ইতিমধ্যে আমাদের সন্তানেরা এসে সাহিত্য একাডেমিতে স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি শুরু করেছে। বিশ্বের অষ্টম কথ্য ভাষাটি আমাদের বাংলা ভাষা। বিশ্বজুড়ে ২৪০ মিলিয়ন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। সাহিত্য চর্চার জন্য বিশ্বের অনেক মানুষ বাংলা ভাষাকে পছন্দের তালিকায় বেছে নেয়। আমেরিকার সর্বত্র বাংলা ভাষা দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করলেও সে বিচারে বাংলা ভাষা এখনো বিশ্বের দরবারে সমাদৃত নয়। বিশ্বের অন্যতম মধুর ভাষা, বাংলা ভাষায় রচিত নির্বাচিত সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বের সাহিত্য দরবারে পৌছে দেয়ার স্বপ্ন দেখে সাহিত্য একাডেমি।

মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, সম্মুখের পথে ধাবিত করে। স্বপ্ন দেখতে পারাটাও বিরাট একটা গুণ। স্বপ্ন দেখলেইতো একদিন সে স্বপ্ন পূরণ হবে। সাহিত্য একাডেমি স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রেরণা দেয়। লেখকদের মনের মন্দিরে স্নিগ্ধ স্বপ্নের বীজ বপনে কাজ করে যাচ্ছে । বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শহীদ কাদরী বলেছিলেন, ‘দেশ থেকে বিদেশে আসলে লেখকদের লেখক স্বত্তার কবর হয়। ‘ তাঁর কথার রেষ ধরে নির্দিধায় বলতেই পারি, মৃত প্রায় গাছে পানি, সার দিয়ে পরিচর্যার মাধ্যমে ফুল ফোটানোর নিদর্শন সাহিত্য একাডেমি। যার উদাহরণ আমি নিজেই এবং সাহিত্য একাডেমির উঠোনে অনু, পরমাণুর মত মমতার বন্ধনে জড়িয়ে থাকা অনেক কবি, লেখকেরা। প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার সাহিত্য একাডেমির নিয়মিত আসরে সবার শুদ্ধ অনুভূতি প্রকাশে যার পরিস্ফুটন ঘটে। প্রত্যাশা করি আমাদের ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’ অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকুক লেখকদের ভালোবাসায়, ভাবনায়, কলমের কালিতে বইএর পাতায়!

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সঙ্গবদ্ধ হয়ে থাকতে মানুষ পছন্দ করেন। করোনাকালে শারীরিক সুস্থতার সাথে মানসিক সুস্থতাও জরুরি। করোনাকালে আমরা সাহিত্য একাডেমির বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি একে অপর থেকে। করোনা মহামারী প্রতিরোধের উপায় ব্যক্তিগত দূরত্ব মেনে চলে এই সময়ে সাহিত্য একাডেমির মাসিক আসরগুলো না হলেও, সাহিত্য একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেনের তত্ত্বাবধানে ভারচুয়াল আড্ডার আয়োজন করা হয়। সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে জড়িত এবং একই সাথে আগ্রহীদের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য এই পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ম্যসেঞ্জার গ্রুপ করা হয়েছে। গ্রুপের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে এই সমস্ত গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। প্রতি গ্রুপের সংখ্যা আটের অধিক নয়। তাঁদের প্রতি পরিচালকের পরামর্শ রয়েছে, যেন তাঁরা মাসে একবার যোগাযোগ রাখেন। পারস্পরিক ভাব বিনিময়, সান্নিধ্যের জন্য ছোট ছোট গ্রুপ। সেখানে নিজেদের কুশল বিনিময়ের সাথে সাথে সাহিত্য বিষয়ক কথাও থাকে। এই গ্রুপগুলোর এক একটির নামও আছে। প্রতিটি গ্রুপে পরিচালক নিজে উপস্থিত থাকেন। সাহিত্য একাডেমির সাথে জড়িত এমন যে কেউ তাঁর সাথে যোগাযোগ করে গ্রুপ খুলে পারস্পরিক যোগাযোগ রাখতে পারেন। সাহিত্য একাডেমির মূল লক্ষ্য পারস্পরিক খোঁজ খবর রাখা। সাহিত্য একাডেমির পরিধি এবং সংশ্লেষন অনেক বড়। সবাইকে এক সাথে ‘জুম’ অ্যাপে উপস্থিতির কথাও ভাবা হচ্ছে। আশা করি ভবিষ্যত অবস্থার উপর ভিত্তি করে সাহিত্য একাডমির ‘গ্রুপ আড্ডা’ সবার অংশগ্রহণে সরাসরি ‘সাহিত্য একাডেমি’র মাসিক আসর কিংবা সমাবেশ হয়ে উঠবে।

দিন শেষে অন্ধকার নামে। সময় কুয়াশার মতো শূন্যে হারিয়ে যায়। গ্রীষ্ম -বর্ষা- শরৎ শেষে হেমন্তও যাই -যাই। কিন্তু করোনা বিদায় হওয়ার নাম নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম একমাস বা দুইমাস, কিংবা তিনমাস থাকবে করোনা। আজ ভাবছিÑ আমাদের ভবিষ্যৎ বা কার ভাগ্যে কী আছে, কেউ জানি না।

স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্নের কোন হাইফেন নেই। মাসের শেষ শুক্রবার এলে করোনাক্রান্ত একঘেঁয়ে জীবনের ধাক্কা সামলে, স্বপ্ন দেখা মন দশদিক আলো করে হেসে উঠে। হাসির কোন দুর্যোগ নেই, নেই কোন দুঃখ-ভয়। এই হাসিটাই যে করোনাকালে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল! স্বপ্ন দেখি এই মলিন বিবর্ণ সময় কেটে, উৎসব- উদ্দীপনায় সকলে হেসে উঠবো সহসাই, সাহিত্য একাডেমির ঘরটিতে! লেখকদের ভালোবাসা, আনন্দ হয়ে আমাদের সাহিত্য একাডেমি বেঁচে থাকুক অনন্তকাল ধরে – শুভক্ষণে এ প্রত্যাশা রাখছি! দশম বর্ষপূর্তিতে সাহিত্য একাডেমির উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি! সাহিত্য একাডেমি এগিয়ে চলুক আপন মহিমায়!

শেয়ার