৯ বছর পেরিয়ে এক দশকে পুনশ্চ, যশোর

অধ্যাপক সুকুমার দাস।।
২০০১ সালের ১লা ডিসেম্বর জন্ম হলো একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নাম তার পুনশ্চ। সমবায় ভবনের তিনতলাতে উলশী হিমাগারের পিন্টু ভাইয়ের দাক্ষিণ্যে অস্থায়ীভাবে চলতে থাকলো উঠা-বসা সাথে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। ৭দিনের মাথায় আয়োজন করা হলো টাউন হল মাঠের উন্মুক্ত মঞ্চে সদ্য প্রয়াত ভূপেন হাজারিকা ও অজিত রায় স্মরণে গণসঙ্গীতের আসর। অজিত রায়কে নিয়ে বলেন সংস্কৃতিজন আবু সালেহ তোতা আর ভূপেন হাজারিকা সম্পর্কে আলোচনা করেন কবি ফখরে আলম (বর্তমানে দুইজনই প্রয়াত)। আলোচনা শেষে অজিতদার সুর করা ৪টি গণসঙ্গীত সমবেত কন্ঠে আর ভূপেন হাজারিকার ১০টি গান করেন সুকুমার দাস একক কন্ঠে।

৩১ডিসেম্বর’১১তে ‘জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা’ ভবনে ২টি ঘরের ব্যবস্থা করে দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব মুস্তাফিজুর রহমান। ঋণী দৈনিক প্রথম আলোর মনিরুল ইসলাম এর কাছেও। ৮ ডিসেম্বর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সদস্যপদ লাভ ও জুন মাসে ধ্রুব পরিষদ, বাংলাদেশ এ নিবন্ধিত হয় পুনশ্চ, যশোর।
২০১২ জানুয়ারি থেকে পুনশ্চ সঙ্গীত বিদ্যায়তন এর যাত্রা শুরু। ২০১২সালে ধ্রুব পরিষদ, বাংলাদেশ আয়োজিত পরীক্ষায় (২০১৩ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য) সারাদেশের শতাধিক স্কুলের মধ্যে ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করে।
জন্মের ৭৫ দিনের মাথায় টাউন হল মাঠের রওশন আলী মঞ্চে ৪ ঘণ্টাব্যাপী বসন্ত উৎসব, সাড়ে চার মাসের মধ্যে ৩০চৈত্র পালন (যা যশোরে প্রথম)। ঠিক একবছরের মাথায় ২২ডিসেম্বর ১২তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২দিনের এক গণসঙ্গীত উৎসবে যোগদান। এ জন্য সানোয়ার আলম খান দুলুর কাছে কৃতজ্ঞ।

২০১৩ সালে আবারও আমন্ত্রণ থাকলেও যাওয়া হয়নি গণজাগরণ মঞ্চের কারণে। ঐ ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে প্রতিদিন বিকালে সকল সাংস্কৃতিক কর্মীর ঠিকানা ছিল চিত্রার মোড়। যশোরের সকল সংস্কৃতি প্রিয় মানুষের মাঝে পুনশ্চ দ্রুত পরিচিতি লাভ করে তার প্রতিদিনের গণসঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে।

২০১৩ সালে কাজ শুরু হল নাটক নিয়ে। দেবদুলাল রায় এর নেতৃত্বে একের পর এক পথনাটক, শিশুদের নিয়ে কাজ সাথে মঞ্চনাটক। আর,আর,এফ আয়োজিত ‘‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা-২০১৩’’ শীর্ষক দেশব্যাপী ৩০টি দলের অংশগ্রহণে পথনাটক প্রতিযোগিতায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করে ১০০০০টাকা পুরস্কার ও ট্রফি জয় পুনশ্চ কে আরো বেশি উৎসাহিত করে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বহরমপুরে ৩দিনের লোকসঙ্গীত এর আয়োজনে ও এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় গণসঙ্গীত উৎসবে অংশগ্রহণ। ২০১৭ সালে আবারও ভারত সফর জানুয়ারিতে, ফিরে এসে বসন্ত উৎসবের আয়োজন ৪ঘন্টা জুড়ে।

২০১৫ সালের ২৭মার্চ বিশ্বনাট্য দিবসে ১দিনে ৬টি পথনাটকের উৎসব আয়োজন করা হয় টাউন হল মাঠে, যেখানে প্রতিটি নাটকের মাঝে ১টি করে সমবেত নৃত্য পরিবেশিত হয়।

২০১৬ সালের নভেম্বরে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’র ৪০ বছর পূর্তির আয়োজনে ঢাকাতে গণসঙ্গীত পরিবেশন এবং এ বছরের শেষদিনে টাউন হল মাঠে দুই ঘণ্টাব্যাপী নৃত্যগুরু মুক্ত বিশ্বাসের পরিচালনায় নাচের অনুষ্ঠান করা হয়।

২০১৮এর জানুয়ারিতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিনে সুকুমার দাস এর সুরারোপিত কবির রচিত ব্রজঙ্গনা কাব্য, নাটকের গান, চতুর্দশপদী কবিতার গান নিয়ে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে ১৪টি গানের একটি সিডি উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী, নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম দুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী, স্কুলবন্ধু ঢাকার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার সদ্য প্রয়াত (করোনায় আক্রান্ত হয়ে) বজলুল করিম চৌধুরী ও আনোয়ার গ্রুপ এর নির্বাহী পরিচালক মনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এ আয়োজন ছাড়াও বিভিন্ন বছর খুলনা বেতারে মধুসূদন দত্তের গান পরিবেশন করে পুনশ্চ এর শিল্পীরা।

২০১৯ এ ‘‘পুনশ্চ সঙ্গীত” উদ্বোধন হয় ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে, যা রচনা করেছেন যশোর তথা দেশের অন্যতম গীতিকার, সুরকার, শিল্পী শ্রদ্ধেয় আশরাফ হোসেন।

২০২০সালে করোনাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু’র মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে ১৫থেকে ৩১আগষ্ট প্রতি একদিন অন্তর একটি করে (বঙ্গবন্ধু স্মরণে) পুনশ্চ, যশোর এর নিজস্ব গান তাদেরই ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রেও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এ বছর।

জন্মের পর থেকে প্রতি বছর টাউন হল মাঠে ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র জয়ন্তী, ১লা ফাল্গুন বসন্ত উৎসব, ১৮ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, সেপ্টেম্বর মাসে সঙ্গীত বিদ্যায়তন এর সনদপত্র বিতরণ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করা হয়। এছাড়া ঘরোয়াভাবে ১১জ্যৈষ্ঠ নজরুল জয়ন্তী, শীতকালে পিঠা উৎসব, জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল উৎসব করে আসছে শুরু থেকে।

এবছর করোনাকালে সকলের সবকিছু বন্ধ থাকলেও পুনশ্চ, যশোর অনলাইনে বাংলা নববর্ষ, ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র জয়ন্তী, ১১জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জনপ্রিয় দলের সাথে তিনদিনব্যাপী নজরুল জয়ন্তী, ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্র ও ১৩ভাদ্র নজরুল প্রয়াণ দিবস, কিশোরদের নিয়ে শরৎ উৎসব, লোক শিল্পীদের নিয়ে সহজিয়া গানের আয়োজন করে।

এর বাইরে পুনশ্চ, যশোর এর শিল্পীরা দেশে গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদসহ নানা আয়োজন ছাড়াও বিদেশে (ফ্রান্স, কানাডা, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিম বাংলার মালদার ওচঞঅ এর সাথে) একক লাইভে অংশ নেন সুকুমার দাস, সজীব পাল,লক্ষী রানী বৈদ্য, শায়ন্তনী দেবনাথ, বিদিশা মিত্র, রুবাইয়া আনজুম দ্যুতি, অন্বেষা বিশ্বাস কথা,আরাত্রিকা শ্রেষ্ঠা, ঋত্বিকা বিশ্বাস শিমু প্রমুখ।

পুনশ্চ শুরু থেকেই প্রতি বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দেশবরেণ্য লেখক-কবিদের লেখা, সংগঠনের একবছরের কাজের বিবরণসহ মূল মূল অনুষ্ঠানের ছবি সম্বলিত ও আশুতোষ পাল এর সুদৃশ্য ও ব্যতিক্রমী প্রচ্ছদে স্মরনিকা প্রকাশ করে থাকে।

প্রথম থেকে শিল্পী ও দর্শক সৃষ্টির লক্ষ্যে মাসিক বাংলা গানের আসর ‘একতারা’র আয়োজন করে আসছে। ২১সেপ্টেম্বর’১২ শাহ্ আব্দুল করিম এর গান নিয়ে প্রথম অনুষ্ঠান করে। কখনো একক, কখনো দুইজন, কখনো আবার ৪-৫ জনকে নিয়ে, এখানে নবীন-প্রবীন, শিশু-কিশোর সকলেই অংশ নেয়, উদ্দেশ্য গান গাইবার মেজাজ ও মানসিকতা তৈরি করা।

প্রতি ২বছর অন্তর পুনশ্চ কাউন্সিল করে কমিটি পুনর্গঠন ও আর্থিক প্রতিবেদন সাধারণ সদস্যদের মাঝে পেশ করে ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

পুনশ্চের সঙ্গীত,যন্ত্র,নাটক,নৃত্য, চারুকলা আবৃত্তিসহ প্রায় সব বিভাগেই ছাত্র-ছাত্রী আশানুরূপ, তবে সমস্যা অর্থের, যা কমবেশি সকলেরই আছে, তবে আমাদেরটা ঘর নিয়ে। ঘরের অত্যাধিক ভাড়ার পাশাপাশি ঘর পাওয়া ও স্থায়ীভাবে বসবাসের চরম অনিশ্চয়তা, এ সমস্যা মূল মূল সংগঠনের নেই বললেই চলে দু-একটি ছাড়া।
মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতায় (আর্থিক ও আত্মিক) আজ পুনশ্চ এখানে দাঁড়িয়ে, সামনে এগিয়ে যেতে চাই, ‘সব বাঁধা মাড়িয়ে,পুনশ্চ বাতিঘর জ্বালিয়ে’। যার বিকল্প নেই, জয় আমাদের হবেই।
১০বছরে পদার্পণকালে সকল শুভার্থীদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, পুনশ্চ, যশোর।।

 

 

 

 

শেয়ার