প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়ে (প্রথম পর্ব)

56
প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়ে

চন্দ্রশিলা ছন্দা

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েবৈশ্বিক মহামারীর থাবায় আটকে আছে পৃথিবী। আটকে আছি আমিও। তার চোখরাঙানিতে এইতো কিছুদিন আগেও ঘরে বন্দি ছিলাম। বন্দিদশায় আকাশ টেনেছে, বাতাস উড়িয়ে নিতে চেয়েছে। প্রকৃতির রঙগুলো স্বপ্নে আসতে আসতে এক সময় ঝাপসা হতে শুরু করেছে। প্রথম ঢেউয়ে মানুষের আহাজারি মনের নদীতে তুলেছে জলোচ্ছ্বাস। ভাসিয়ে নিয়েছে কান্নার সাগরে। দম বন্ধ হয়ে এসেছে তখন। যদিও আপনজনের মধ্য থেকে তখনও হারায়নি কিছুই। শুভ ভয় ভর করেছিল। আর চলমান দ্বিতীয় ঢেউ ফেউ হয়ে উঠেছে এখন। আর পারি না। ভ্রমণপিয়াসু উচ্ছ্বল আমার মন ফেউকে দিতে চায় ভয়। অদেখা ছোট্ট সময়ের জাহাজে ভেসে দেখতে ও দেখাতে চাই অনেক কিছুই। তাই চলে গেলোম প্রকৃতির কাছে। সেই গল্পই বলবো আজ।

বেড়ানোটা আমার জন্য শুধু ঔষধ নয়, মহাঔষধ। এবার এমন কোথাও যেতে চাইছিলাম, যেখানে গেলে কেউ জিজ্ঞেস করবে নাÑ কেমন আছো বা আছেন? মা বোনের আদর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের একটি; সেখানেও নয়। চাচ্ছিলাম এমন একটা ট্রিপ, যেখানে কেউ বলবে নাÑ আজ কী খাবি? দেখছিস তো বাসায় মেহমান আছে অথচ দ্যাখ, কাজের মেয়েটা আজ আসলো না! এতো বিবেকহীন! ইত্যাদি ইত্যাদি। চাকরি কিংবা বিজনেস নিয়ে মনে মনে জমে ওঠা হতাশার এই সব বহুবিধ সমস্যা চক্রাকার জীবনের ঘূর্ণন থেকে বের হতে চাচ্ছিলাম। আর এই চক্র থেকে পরিত্রাণ পেতে ‘সাজেক’ ধরা দিলো।

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েপৃথিবীর সৌন্দর্য দেখা আমার কাছে এক রকম এবাদত। স্রষ্টার কাছে মাথা নত করার একান্ত উপযুক্ত সময় এবং স্থান আমার কাছে প্রকৃতি। সেই প্রকৃতি অনুভবের জন্য দুটি চোখ, শক্তি ও সামর্থ দিয়েছেন বলে আমি ¯্রষ্টার কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আলহামদুলিল্লাহ। আমার অনুভবের ক্ষমতা বেশি বা এতো সংবেদনশীল মন বলেই হয়তো আরও একটা বিষয় চোখ এড়ালো না। আর সেটা হলোÑ নাকাপা বাজার, রামগড় থানা। এখানে মসজিদ, মুসল্লি আর বাঙালির রমরমা বসবাস। পাহাড়ি খুবই কম। আমার ভ্রমণে চোখে পড়েনি অবশ্য। অথচ পিঠে ঝাঁপি ওয়ালা লুসাই-মারমা মেয়েদের খুঁজছে আমার চোখ।

যা হোক ধুলোবালি আর রোদ গরমে নন-এসি বাসের যাত্রা মন্দ ছিলো না। খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা পথে যেতে যেতে বিশালতম চা বাগানের সবুজে চোখ ধুয়ে নিতেই মাটির ঘ্রাণে অভ্যস্ত নাকে ঝাপটা লাগলো গাছেদের ঘ্রাণে। রামগড়, মাটিরাঙা এসব নাম না জানা পথ এবং আকাশের ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রাণের নির্যাস যখন নিচ্ছিলাম, তখন আমি শুকরিয়া আদায় করিÑ ¯্রষ্টা আমাকে এমন তীব্র ঘ্রান ইন্দ্রিয় দিয়েছেন বলে। প্রতিটি সেকেন্ডের ঘ্রাণ আমার বুকের ভেতরে নিতে নিতে এগুচ্ছিলাম। এ যেন এক অলৌকিক পাওয়া। মেয়েকে বললাম, কোন ঘ্রাণ পাচ্ছো? সে বললো না তো! মনে মনে বললাম, যদিও তুমি অধরা অদৃশ্য, তবুও তোমাকে ভালোবাসি মহুয়া। তোমার সৌরভে অলৌকিক ধরা দিয়েছো তুমি লৌকিক সময়ে। ঘ্রাণে চিনেছি তোমায় প্রাণের স্পন্দনে।

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েখাগড়াছড়ি পৌঁছে সন্ধ্যার খানিক আগে স্থানীয় পার্ক দেখতে বের হলাম। পাহাড়ঘেরা চমৎকার প্রকৃতি। মন এতো ভালো যে শরীরের এদিক সেদিক ব্যথা পাত্তা পেলো না। তখনও জানি না কী অপার সৌন্দর্য অপেক্ষা করছে সাজেকের পথে পথে। অমসৃণ পথের ধকল বলে কিছু আছে তা মনে ঠাঁই পাচ্ছিলো না। কোথাও কোথাও বিপদজনক বাঁক ছিলো। রোলারকোস্টারের মত কখনো সাঁই করে নিচে নামা, কখনো খুব কষ্ট করে খাড়া পাহাড়ে গাড়ি নিয়ে ওঠা অন্যরকম দোলা দিচ্ছিলো মনে। পথের দুপাশে পাহাড়ি ছেলে মেয়েরা গাড়ি দেখলেই হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছেÑ ব্যাপারটায় আরেক অনুভূতি। কিছু পরেই বুঝতে পারলামÑ এমন যে হাত নাড়াটা, এটা তাদের অবচেতন অভ্যাস; শিক্ষাও বলা যেতে পারে। দুধের বাচ্চাও গাড়ির শব্দ শুনে মায় থেকে চকিতে মাথা তুলে টাটা দিয়ে ফের খেতে মনোযোগী হচ্ছে। কিন্তু টাটা তাকেও দিতেই হবে।

প্রকৃতি-রঙিন গালিচায় চড়েনিয়মের বাইরে যেতে চাইলেও নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু নিয়ম মেনে যাত্রা করতে হয়। ‘চান্দের গাড়ি’ বা ‘চাঁদের গাড়ি’ বলে পরিচিত কয়েকটি গাড়ির সাথে বাইক পর পর দাঁড়িয়ে থাকবে। যেন ‘এপেন্টি বায়োস্কোপ’ খেলতে হবে। সব গাড়ি একসাথে হলে সেই বহরের সামনে আর্মিদের একটা গাড়ি আর পেছনেও একটি। টাইমলি দিনে একবারই যাত্রা করবে সাজেকের পথে। দীঘিনালায় সব গাড়ির বহর একখানে হলো। আমরা তার একটিতে।

আকাশটা তখন চমৎকার আকাশী রঙের শাড়ি পড়েছে! আর হাজারও রকম ছোটবড় গাছগাছালি সেজ আছে মখমলে সবুজ চাদরে। আমার চোখের বৈঠা প্রকৃতির রঙের নদীতে বাইছে তো বাইছেই। আমরা চলেছি সাজেকের পথে।

লেখক: কবি, গল্পকার