বিষাদে নীল ফুটবল বিশ্ব

 মারাদোনার চিরবিদায়ে শোকে কাতর ফুটবলপ্রেমীরা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ বিষাদে নীল ফুটবল বিশ্ব। শোকে কাতর ফুটবলপ্রেমীরা। দিয়েগো মারাদোনার মৃত্যুতে প্রিয়হারা বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনেও। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত বুধবার ৬০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন মারাদোনা। প্রায় একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন তিনি। তার হাত ধরেই নাপোলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সেরি আয়; জিতেছিল শিরোপা। মাঠের বাইরে কোকেন, মাদকে আসক্তি, সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে গুলি ছোঁড়া, পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রতি তার সহমর্মিতা, রাজনৈতিক দর্শন-সব কিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন বর্ণিল এক চরিত্র।

৬০ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপারে পাড়ি দিলেন দিয়েগো মারাদোনা। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে বুধবার মারা যান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত এই আর্জেন্টাইন।
আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে খবরটি নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির প্রধান ক্লাওদিও তাপিয়া শোকবার্তায় বলেন, “আমাদের কিংবদন্তির মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত, দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। সবসময় তুমি আমাদের হৃদয়ে থাকবে।”

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার মারাদোনা একক নৈপুণ্যে দেশকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। ফুটবল কীর্তির বাইরেও যিনি ছিলেন বর্ণময় চরিত্রের অধিকারী। পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানানোর পরও নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে প্রায় সবসময়ই ছিলেন খবরের শিরোনাম হয়ে।

দেশের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলা মারাদোনা জাতীয় দলের হয়ে ৯১ ম্যাচ খেলে করেছিলেন ৩৪ গোল। ৮৬’র বিশ্ব জয়ের পরের বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন মারাদোনা। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ে হেরে যায় সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে।

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র আসরেও দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি; কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে দুই ম্যাচ খেলেই দেশের পথ ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। গ্রুপ পর্বে গ্রিসের বিপক্ষে জয়ের পর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটিই হয়ে থাকে তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ।

বুটজোড়া তুলে রেখে কোচিং ক্যারিয়ারে পা রাখেন মারাদোনা। ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন আর্জেন্টিনার ডাগআউটে। কোচ হিসেবে অবশ্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি তিনি। গতবছর থেকে স্বদেশের ক্লাব হিমনেশিয়ার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

গত ৩০ অক্টোবর ৬০তম জন্মদিন পালন করার তিন দিন পর শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করায় মারাদোনাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে পরের দিন তার অস্ত্রোপচার করানো হয়।
অস্ত্রোপচার সফল হলেও হঠাৎ করে অ্যালকোহল পরিহার করায় কিছু সমস্যা দেখা দেয় তার। একারণে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল মারাদোনাকে।

দেশের বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া মারাদোনা ক্লাব ক্যারিয়ারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন নাপোলিতে। ইতালিয়ান ক্লাবটিকে জিতিয়েছিলেন তাদের ইতিহাসের প্রথম সেরি আ শিরোপা, ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে। দুই মৌসুম বাদে দলটির হয়ে জিতেছিলেন দ্বিতীয় সেরি আ। এখন পর্যন্ত ওই দুবারই লিগ শিরোপা জিতেছে নাপোলি।

১৯৮২ সালে বার্সেলোনার হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে পা রাখেন মারাদোনা। কাতালান ক্লাবটিতে দুই মৌসুম খেলে পাড়ি দিয়েছিলেন নাপোলিতে। ক্যারিয়ার জুড়ে মারাদোনা গড়েছেন ইতিহাস, জন্ম দিয়েছেন নানা কীর্তি, হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি।

মারাদোনার শোকে কাঁদছে গোটা বিশ্ব। দিয়েগোর সঙ্গে আমার কত স্মৃতি, কত খুশির মুহূর্তৃবলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন হোর্হে ভালদানো। খবর শোনার পর থেকে কাঁদছে বুয়েনস আইরেস, কাঁদছে আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্বেরও একই অবস্থা। শোকে ভাসছেন এক সময়ের সতীর্থরা। সাবেক-বর্তমান খেলোয়াড়রা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছেন অসীমের দিকে চলে যাওয়া দিয়েগো মারাদোনাকে।

ভালদানো ছিলেন মারাদোনার বিশ্বজয়ের সারথী। কদিন আগে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। সুস্থ হয়ে ফিরেছিলেন বাড়িতে। ভালদানো ভেবেছিলেন, এই যাত্রায় শঙ্কা কাটিয়ে উঠেছেন তার অধিনায়ক। ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত মারাদোনা এভাবে জীবনে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবেন, ভাবতেও পারছেন না আর্জেন্টিনার সাবেক এই ফরোয়ার্ড।

“আর্জেন্টিনার সবাই আজ তার জন্য কাঁদছে। যারা ফুটবল ভালোবাসে, তারাও কাঁদছে। এমনকি তার বিদায়ে আজ ফুটবলও কাঁদছে।”

মারাদোনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বুধবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সব ম্যাচে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এই সপ্তাহের সব ম্যাচেই তা করা হবে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা জানান, এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনায় দেখা একটা ব্যানারের কথা মনে পড়ছে তার।
“বছর খানেক আগে ব্যানারটা দেখেছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, তোমার জীবনে তুমি কি করেছো তা কোনো ব্যাপার নয় দিয়েগো, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তুমি আমাদের জন্য যা করেছো। তিনি আমাদের যা দিয়েছেন সেটা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে এই লেখায়।”

শোকে ভাসছেন সাবেক আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মাউরিসিও পচেত্তিনো। “দিয়েগো আপনি আমার নায়ক ও বন্ধু। আপনার সঙ্গে ফুটবল ও জীবন ভাগ করতে পেরে আমি ভাগ্যবান।”

ভাটিকান জানিয়েছে, পোপ ফ্রান্সিস যিনি একজন আর্জেন্টাইন এবং ফুটবল ভক্ত তিনি তার প্রার্থনায় মারাদোনাকে স্মরণ করবেন। এক সময়ের সতীর্থ ও আতলেতিকো মাদ্রিদ কোচ দিয়েগো সিমেওনের কাছে মারাদোনা স্বয়ং ফুটবল। সাবেক আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার হাভিয়ের জানেত্তির কাছে মারাদোনা অনন্য।
“সব চ্যালেঞ্জ মাড়িয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত ছিলেন দিয়েগো। তিনি চলে গেছেন, এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। এই খেলা ভালোবাসে এমন সবার জন্য আজ বেদনার দিন। নাপোলি অধিনায়ক লরেন্সো ইনসিনিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন মারাদোনাকে।

“আপনি ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। আপনি আমাদের দিয়েগো। আপনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অস্বীকার করছি না সে সময় আমার পা কাঁপছিল। একজন ভক্ত, একজন নাপোলিতান ও একজন খেলোয়াড় হিসেবে বলছি, সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ দিয়োস। সব সময়ই আপনাকে ভালোবাসব।”
আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার হুয়ান পাবলো সোরিন এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, তারা বিধ্বস্ত, শোকাহত।
“খবরটা আসার পর থেকে ঘরে আমাদের কান্না থামছে না। আমরা পরের দিনটির জন্য অপেক্ষা করছি। সকালে উঠে যখন শুনবো, এটা মিথ্যা, মৃত্যুকে আবারও তিনি ড্রিবল করে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তিনি অমর।”

শেয়ার