সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মৎস্যভান্ডার লুটছে প্রভাবশালীরা, বড়ধরণের ক্ষতির শঙ্কা

এমাদুল হক (শামীম), সুন্দরবন থেকে ফিরে॥ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য ভান্ডার লুট করার অভিযোগ উঠেছে বন সংলগ্ন এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। যার ফলে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে আগুনে পুড়ে সুন্দরবনের ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে কয়েক দফা অগ্নিকান্ডের পর বনের বিভিন্ন বিল, জলাশয় ও খালে মাছ ধরা বন্ধ করে বনবিভাগ। সেই সময় এক মাসের ব্যবধানে ধানসাগর স্টেশনের গভীর অরণ্যে একাধিক নাশকতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় বনের কয়েকশ’ একর বনভূমি। ওই সময় বনমন্ত্রী ও বন সংরক্ষক দুর্ঘটনা স্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা সুন্দরবনের প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় জরুরী কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। ওই প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী লোকালয় থেকে কাঠাখালী, বরইতলা, জীউধারা, আমুরবুনিয়া, গুলিশাখালী, কলমতেজী, ধানসাগর, নাংলী টহল ফাঁড়ি পর্যন্ত একাধিক ওয়াচ টাওয়ার ও কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ। সুপরিকল্পিতভাবে নাশকতার আগুন দিয়ে যাতে কোন অসাধু ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে মাছ আহরণ করতে না পারে সেজন্য ছোট বড় ২৩টি বিলে একাধিক পুকুর খনন করা এবং মাটি দিয়ে অবশিষ্ট বিল ভরাট করে সেখানে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন করা। কিন্তু ওই কর্ম পরিকল্পনার ২/১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও অধিকাংশ প্রকল্প এখনও রয়েছে ফাইলবন্দি।

অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরে ওই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কতিপয় অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী মোটা অংকের উৎকোচে ম্যানেজ করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে সুন্দরবনের তুলাতলা, পচাঁ কোরালীয়া, নাপিতখালী, কলমতেজী, ট্যাংড়ার বিলের নানা প্রজাতির মাছ ফ্রি স্টাইলে লুটে নেওয়া হচ্ছে । এতে বন সংলগ্ন রতিয়া রাজাপুর, পশ্চিম রাজাপুর, উত্তর রাজাপুর, দক্ষিণ রাজাপুর এলাকার শতাধিক জেলের অংশ গ্রহণ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে, পশ্চিম রাজাপুর ও উত্তর রাজাপুর এলাকার কয়েকজন জেলে বলেন, শুষ্ক মৌসুম শুরুতে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনসহ বিভিন্ন টহল ফাঁড়ির আওতাধীন বিলগুলোতে শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জসহ বন সংলগ্ন এলাকার সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তাদের উৎকোচে ম্যানেজ করে চাঁদপাই রেঞ্জের ওই সব বিল থেকে কৈ, শিং, মাগুর, শোল, কোরাল, গলদা, টাকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির শত শত মণ মাছ কারেন্ট জাল ও টোন জালের মাধ্যমে আহরন করে চলছে। সেখান থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মণ মাছ ও কাঁকড়া ধরে মোটরসাইকেলযোগে একাধিক রুট ব্যবহার করে খুলনা, রুপসা, মংলা, রায়েন্দা, মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর এলাকায় চালান করে দেন। ওই চক্রের সংঙ্গে পশ্চিম রাজাপুর ও উত্তর রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ পহলান, মধু বেপারী, রিয়াজ হাওলাদার, সোহেল ব্যাপারী, বাদল, সবুর মৃধাসহ অনেকেই জড়িত রয়েছেন। এরা বনবিভাগকে ম্যানেজ করার নামে প্রতিজন জেলের কাছ থেকে মাসিক ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করছেন।

তবে, এ ব্যাপারে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মাছ লুটের খবর তার জানা নেই। ইজারা দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব। তবে বনবিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্থানীয় জেলেরা লোকালয় সংলগ্ন খাল থেকে খাবারের জন্য কিছু মাছ আহরন করছেন।

অন্যদিকে, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. এনামুল হক জানান, বন-বিভাগের যোগসাজসের বিষয়টি সঠিক নয়। তবে ,অবৈধভাবে মাছ আহরনের বিষয়টি জানতে পেরে বনবিভাগ ওই এলাকায় ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে জেলেদের ২টি টোং ঘর গুড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ওই সকল বিলগুলোর দিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া বন রক্ষায় ২০১৬ সালে গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

শেয়ার