ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভৈরব নদের ওপর নির্মিত সেতু উদ্বোধন

পদ্মা সেতুর সাথে সংযুক্ত হলো অভয়নগর : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যশোরের অভয়নগরে ভৈরব নদের ওপর নির্মিত সেতু উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভৈরবের ওপর সেতুটি নির্মাণের ফলে যশোরের সাথে অভনগরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজ হয়ে উঠবে। এমনকি নড়াইলের মানুষজনও এই সেতু থেকে উপকৃত হবেন। এছাড়া নতুন এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে অভয়নগর এলাকাটিও পদ্মা সেতুর সাথে সংযুক্ত হলো। তিনি বলেন, যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করবে এই সেতু। এতে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থার যেমন উন্নতি হবে; তেমনি কৃষি-শিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের পরিবহন আরো অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠবে। এমনকি নদী বন্দরগুলোর সম্প্রসারণেও সহায়ক হবে। যার ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি হবে আরো বেশি মাত্রায় গতিশীল।

গতকাল রোববার বেলা ১১ টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও গণভবন থেকে তিনি ভিডিও কনফারেন্সে যশোরসহ মাগুরা ও নারায়নগঞ্জে নবনির্মিত তিনটি সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন হওয়া অন্য দুটি সেতুর একটি মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলায় মধুমতি নদীর ওপর এলাংখালী ঘাটে নির্মিত ‘শেখ হাসিনা সেতু’। অন্যটি হলো নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে নির্মিত ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) সেতু’। এই তিনটি সেতুর পাশাপাশি পাবনা শহরে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের নামে নির্মাণ হওয়া স্বাধীনতা চত্বরেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা আরো বলেন, এই তিনটি সেতু এ সমস্ত অঞ্চলগুলোর আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখবে। তাছাড়া আমরা পদ্মাসেতু করেছি দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। যেটা আগে একসময় খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। পদ্মাসেতু হয়ে গেলে আর সেই সমস্যাটা থাকবে না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে যোগাযোগের একটা ব্যাপক নেটওয়ার্ক আমরা গড়ে তুলেছি।

এদিকে, উদ্বোধন উপলক্ষে ভৈরব সেতুর দু’পাশে বিভিন্ন রঙের পতাকা টাঙানোসহ রেলিংয়ে জাতীয় পতাকার রং লাল-সবুজে সাজানো হয়। উদ্বোধনের পর থেকে সেতু দিয়ে সব প্রকার যান চলাচল শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভয়নগর উপজেলার ভৈরব নদের পশ্চিম পাশে মশারহাটি এবং পূর্বপাশে দেয়াপাড়া গ্রাম দুটির মধ্য সংযোগ স্থাপন করেছে সেতুটি। ৭০২ দশমিক ৫৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯২ কোটি ৭৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ও ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৪ লাখ টাকা। ‘যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলায় যশোর-খুলনা মহাসড়কের ভাঙ্গাগেট থেকে আমতলা জিসি ভায়া মরিচা, নাউলী বাজার সড়কে ভৈরব নদের এই সেতুটি নির্মাণ হয়েছে। এতে রাতের বেলায় নিরাপদ চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। সেতুর পাশাপাশি নদের দু’পাড়ে প্রটেকশন অ্যাপ্রোচ সড়কও নির্মাণ হয়েছে।

গতকাল যশোর জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার, যশোর-৪ (অভয়নগর-বাঘারপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য রণজিত কুমার রায়, যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) ডা. অধ্যাপক নাসির উদ্দিন, যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক হুসাইন শওকত, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক রফিকুল হাসান, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দীলিপ কুমার রায়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, সহ সভাপতি আব্দুল মজিদ, অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল হক বাবুল, নওয়াপাড়া পৌরসভার মেয়র সুশান্ত কুমার দাস শান্ত, অভয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীর প্রমুখ। এছাড়াও সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনকালে যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত জনপ্রতিনিধিরা অভয়নগরে ভৈরব সেতু নির্মাণ করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এদিকে, গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যশোরের অভয়নগরে ভৈরব সেতুর উদ্বোধন ঘোষণার পর সেতুর দুই প্রান্তের উদ্বোধনী ফলকেরও উন্মোচন করা হয়েছে। ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভয়নগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কেএম রফিকুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সানা আব্দুল মান্নান, আওয়ামী লীগ নেতা ও নওয়াপাড়া বাজার কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, শ্রীধরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রওশন আলী মোড়ল, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ফারাজী, পৌর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুস সালামসহ উপজেলা প্রকৌশল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক ও এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানায়, অভয়নগরের বুক চিরে বয়ে চলা ভৈরব নদ অভয়নগরবাসীকে বিভক্ত করে রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বপ্নের ভৈরব সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় নদের এপরা-ওপার মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনের সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও বাণিজ্যের।

এদিন যশোরের অভয়নগরের ভৈরব নদের ওপর নির্মিত সেতুটি ছাড়াও মাগুরা ও নারায়ণগঞ্জ অন্য দুটি সড়ক সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিন। এছাড়া পাবনায় বেসরকারি অর্থায়নে নির্মিত স্বাধীনতা চত্বরের উদ্বোধন করেন তিনি। ভিডিও কনফারেন্সে নতুন নির্মিত সড়ক সেতুগুলোর উপর তথ্য চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলাধীন মধুমতি নদীর ওপর এলাংখালী ঘাটে ৬০০ দশমিক ৭০ মিটার দীর্ঘ ‘শেখ হাসিনা সেতু’ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে মোট ৬৩ কোটি টাকা ৩১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ও জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এদিকে নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে নির্মিত ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) সেতু’র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ২৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৭৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও জমি অধিগ্রগ্রহণ ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলাধীন মুড়াপাড়া ফেরিঘাট রাস্তায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি ১০ হাজার মিটার রচইনেজে ৫৭৬ দশমিক ২১৪ মিটার দীর্ঘ। এছাড়া উত্তরবঙ্গের পাবনার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলে নামে নির্মিত স্বাধীনতা চত্বরেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিও কনফারেন্সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রথকে এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলাল উদ্দিন এবং পাবনা প্রান্ত থেকে স্বাধীনতা চত্বর বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এবং স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।
অন্যদিকে এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রান্তে, নারায়ণগঞ্জ প্রান্তে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীকসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও উপকারভোগী জনগণ নিজ নিজ প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। গণভবন প্রান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

 

 

 

 

 

শেয়ার