জন্মগত দুটি জরায়ুর একটি ছিল ব্লকড ॥ ধরা পড়লো বয়ঃসন্ধিকালে

ডা. নিকুঞ্জের চিকিৎসায় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেল কিশোরী

জন্মগত দুটি জরায়ুর একটি ছিল ব্লকড ॥ ধরা পড়লো বয়ঃসন্ধিকালেনিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দুটি জরায়ু নিয়ে জন্ম নেয় মেয়েটি। এরমধ্যে একটি ছিল ‘ব্লকড’। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জন্মের ১৫ বছর পর; বয়ঃসন্ধিকালে পা দিয়ে। ব্লকড থাকা জরায়ু দিয়ে মাসিক বের হতে না পেরে তাকে সীমাহীন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। মাসিক (ঋতুকালীন সময়) শুরুর প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া এ যন্ত্রণা স্বজনরা প্রথমে স্বাভাবিক ব্যথা মনে করে মেয়েটিকে প্রায় দেড়বছর যশোর, খুলনা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের নামিদামি গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা ও স্বজনদের রোগ সম্পর্কে কিছুই না বলে ওষুধপথ্য দিয়েছেন। কিন্তু সুফল মেলেনি। সর্বশেষ স্বজনরা এক শিশু চিকিৎসকের কাছে নিলে তিনি রেফার করেন যশোরের বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের কাছে। এ চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে একদিন পরে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। বৃহস্পতিবার রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করেন। এখন ওই কিশোরীটি ভালো আছে এবং তাদের চিন্তার পাহাড় সরে গেছে বলে জানিয়েছেন তার ভাই তাজিমুল হাসান। তাদের বাড়ি যশোরের কিসমত নওয়াপাড়া এলাকায়।

ভাই তাজিমুল হাসান জানান, গত ২০১৯ সালে অক্টোবর মাসে তার আদরের বোন বয়ঃসন্ধিকালে পা দেয়। এসময় তার তলপেটে অতিরিক্ত ব্যথা হলে প্রথমে ভাবিকে জানালে তারা এটিকে সাধারণত (সচরাচর) বিষয় মনে করেন। পরের মাসেও একই সময়ে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। এবার পরিবারের নারী সদস্যরা লজ্জার কারণে পরিবারের পুরুষদের না জানিয়ে তার বোনকে নিয়ে প্রথমে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসককে দেখান। পরে সার্জারি চিকিৎসক ওহিদুজ্জামান আজাদের কাছে যান। চিকিৎসক তার তিন মাসের ওষুধ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরের মাসে আবারও একইভাবে পেটে ব্যথা হলে স্বজনরা চিকিৎসক ওহিদুজ্জামান আজাদের কাছে আবারও নিয়ে আসেন। তখন তিনি গাইনি ডা. নার্গিস আক্তারের কাছে পাঠান। তিনিও ওষুধ দেন কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। পরে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করে রোগ ধরতে না পেরে অন্য চিকিৎসককে দেখাতে বলেন। এরপর পরিবারের স্বজনরা ডা. ইলা মন্ডলকে দেখান। তিনিও রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষা করে রোগ ধরতে পারেননি। পরে তার বোনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। গত চার মাস আগে ঢাকায় নিয়ে গেলে সেখানকার গাইনি চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে একপর্যায়ে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তার বোনের যন্ত্রণার কোনো সুরাহা না হওয়ায় স্বজনরা শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুর রহমানকে দেখান। তিনি শিশুটির রোগ সম্পর্কে শুনে ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারকে দেখাতে পরামর্শ দেন। শিশু চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে গত মঙ্গলবার শিশুটিকে স্বজনরা শহরের একটি ক্লিনিকে ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারকে দেখান। তিনি রোগীর রোগের ইতিহাস শোনেন পরীক্ষা নিরীক্ষার কাগজপত্র দেখে বুঝতে পারেন জরায়ুর জন্মগত ত্রুটি। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার বোনের অপারেশন হলে এখন ভাল আছে।

অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার বলেন, কিশোরী এখন ১০ম শ্রেণিতে পড়ে। অষ্টম শ্রেণি থেকে সে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। রোগের ইতিহাস এবং বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণ করে রোগের বিষয়টি আমি বুঝতে পারি।

এই বিশিষ্ট গাইনি চিকিৎসক আরও বলেন, এই কিশোরীর জন্মগতভাবে দুইটি জরায়ু ছিলো। মাসিকের সময় একটি পথ দিয়ে মাসিক বেরিয়ে যায়। কিন্তু অপর জরায়ুর পথ না থাকার কারণে ওই জরায়ুর মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে ব্যথার সৃষ্টি করে। তখন তিনি ইউনিকর্নয়েট জরায়ুতে থাকা দ্বিতীয় ওই ছোট হেমি- জরায়ু অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলে দিয়েছেন। এখন কিশোরী মেয়েটি স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। তিনি আরও জানান, এর ফলে বিয়ের পর সন্তান ধারণে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

 

শেয়ার