রক্ত দিয়ে রক্তের বন্ধন গড়েন যারা

যশোরে তরুণদের নেতৃত্বে ২০টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন

রক্ত দিয়ে রক্তের বন্ধন গড়েন যারাজাহিদ হাসান
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জের গৃহবধূ রুবিনা আক্তার (৪০)। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুব কমে যাওয়ায় গত ২৪ অক্টোবর শনিবার দুপুরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। জরুরি ভিত্তিতে ১ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। দিনভর রক্তদাতা খুঁজে হয়রান স্বামী আক্তার হোসেন। তার সমস্যার কথাটি পরিচিত একজনকে জানালে ওই ব্যক্তি যশোর ‘আস্থা ব্লাড ব্যাংক’ নামে এক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। সেখানে মিলে যায় রক্তদাতার খোঁজ। গৃহবধূ রুবিনাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ১ ব্যাগ রক্ত দিয়েছে আস্থা ব্লাড ব্যাংকের এক সদস্য। রক্ত দিয়ে বর্তমানে সুস্থ গৃহবধূ রুবিনা। আর রক্ত পেয়ে খুশি স্বামী আক্তার হোসেনও। শুধু করোনার এই দুঃসময়ে নয়; সারাবছরই স্বেচ্ছায় এভাবেই বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে মানুষের পাশে থাকতে কাজ করে যাচ্ছে এসব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

যশোর শহরে ২০টিরও বেশি এমন রক্তদান সামাজিক সংগঠন আছে; যারা স্বেচ্ছায় মানুষের পাশে থাকতে গড়ে তুলেছেন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান সংগঠন। এসব সংগঠনের একটি রুটিন কাজ স্বেচ্ছায় রক্তদান। স্বেচ্ছায় রক্তদানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা ছুটে বেড়ান মানুষের জীবন বাঁচাতে। এমনও হয়েছে রোগীর নাম-ঠিকানাও জানেন না, রক্ত দিয়ে ফিরেন হাসিমুখে।

স্ত্রীর মূমুর্ষ সময়ে রক্ত পেয়ে স্বামী আক্তার হোসেন বলেন, কোনোভাবেই রক্ত ম্যানেজ করতে পারছিলাম না। পরিচিতদের কয়েকজনের গ্রুপ মিললেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণকালে তারা হাসপাতালে আসতে রাজি হয়নি। আস্থা ব্লাড ব্যাংকের রক্ত পেয়ে আমার খুব উপকার হয়েছে। এমনিভাবে রক্ত দিয়ে রোগীর জীবন বাঁচায় একদিকে; অন্যদিকে স্বজনের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে এসব স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান সামাজিক সংগঠনগুলো।
এ রকম আরেক ঘটনা গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার যশোরের বেসরকারি ক্লিনিক কুইন্স হাসপাতালে। মণিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর এলাকার গৃহবধূ সুরাইয়া বেগম। সন্তান সম্ভাবা এই নারীর হঠাৎ করেই দুই সপ্তাহ আগে প্রসব যন্ত্রণা উঠে। দ্রুত তাকে সিজারের জন্য কুইন্স হসপিটালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরেই চিকিৎসক স্বামী আফজাল হোসেনকে দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেন। আত্মীয়-স্বজনের কাছে এই রক্ত না পেলেও ক্লিনিকের জরুরি বিভাগের সামনে যশোর ব্লাড ব্যাংকের পোস্টারে থাকা নাম্বারে যোগাযোগ করেন। সংগঠনের এক সদস্য এসে এক ঘণ্টার মধ্যে এক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। রক্তের সংকট দূর হওয়ার পরে স্বামী আফজাল হোসেন সমাজের কথাকে বলেন, এভাবে কেউ রক্ত দিবে ভাবতে পারেনি। যিনি রক্ত দিলেন, তাকে আমরা চিনতাম না। করোনাকালে তারা যেভাবে এগিয়ে এলেন, সেই ঋণ ভোলার নয়। এদের মতো কিছু লোক সমাজে আছে বলেই সমাজ এখনো টিকে আছে বলে আবেগ আল্পুত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জানা গেছে, এসব সংগঠন যশোরের স্কুল ও কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংগঠনগুলো রক্তের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রক্তদান ছাড়াও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে বিভিন্ন কাজ করে। পাশাপাশি গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক প্রচারণা, প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ নানা কার্যক্রম আছে তাদের। এসব সংগঠনগুলো সংগঠনের সদস্য ও জেলার সামাজিক, রাজনৈতিক, শুভাকাঙ্খীদের দেওয়া অর্থ দিয়ে চলে। এসব তরুণ অধিকাংশ মেসে থেকে বিনামূল্যে মানুষের মুমূর্ষু সময়ে তারা এভাবে মানুষের রক্ত দিয়ে আসছে। তবে, রক্তদাতাদের রক্তের প্রয়োজন মিঠে গেলেই রক্তদাতাদের আর খোজ-খবর রাখেন না রোগীর স্বজনেরা। তার পরেও বিনাস্বার্থে একটি প্রাণ বাঁচাতে তারা যেকোন সময়ে যেকোন দুর্যোগেও তারা ঝাপিয়ে পড়ে মানুষের বিপদে। যশোরে এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে যারা মানুষের কল্যাণে কাজ করে আস্থা, বাঁধন, যশোর ব্লাড ব্যাংক, স্বজন সংঘ,স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা, রাঙাপ্রভাত যশোর সমাজ কল্যাণ সংস্থা, আহ্বান, হাসি-মুখ, যুব উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা, জিরো টিম, ছুটির দিন, বাংলাদেশ ছাত্রবন্ধু ফাউন্ডেশন, রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, স্বপ্ন, আমার যশোর, বনিফেজ, প্রথম আলো বন্ধুসভা যশোর, ব্রাইটার্স সোসাইটি অব বাংলাদেশ, স্বপ্নতরী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, জনতা এক্সপ্রেস, গর্জে ওঠো।

রক্ত দিয়ে রক্তের বন্ধন গড়েন যারাএ বিষয়ে রক্তদান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আস্থার সভাপতি মেহেদী হাসান শিহাব জানান, ২০১৭ সালে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে রক্ত দেওয়া নিয়ে নানা আবেগ ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে। রয়েছে অসংখ্যা স্মৃতিও। কোনটা ভালো আবার কোনটা দুঃখের। সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর তারা বন্ধু ও স্বজনদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সংগঠনের কার্যক্রমের পরিধি বাড়তে থাকে। শুরু হয় ফেসবুক, প্রচারপত্র বিলি, সচেতনতামূলক প্রচারণা। এভাবে গত ৩ বছরে অসংখ্য মানুষের রক্ত দিয়েছি। কখনো ভোর রাতে বা আবার গভীর রাতে মানুষের দরকার হয়ে উঠা রক্ত দ্রুতই ম্যানেজ করে দিয়ে হাসি ফুটিয়েছি রোগী বা স্বজনদের। চলতি বছরে আমাদের ১০ হাজার ব্যাগ রক্ত দেওয়ার টার্গেট পূর্ণ হবে। এ সংগঠনের সাথে আমরা বঙ্গবন্ধু ব্লাড সোসাইটি নামেও একটি সংগঠন চালু করতে যাচ্ছি। এই সংগঠনটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার টার্গেট রয়েছে।
এ বিষয়ে যশোর স্বজন সংঘ’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সাধন কুমার দাস জানান, করোনার মধ্যে হাসপাতালে গেলেই করোনায় আক্রান্ত হবে এমনটি ভেবেই বেশিরভাগ ডোনার রক্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তার পরেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসামগ্রী ও নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমে রক্ত দিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই সংগঠনটি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রক্তদাতাকে রক্ত দিতে উদ্বুদ্ব করা। এই সব সংগঠন শিক্ষার্থী ও সমাজের সামাজিক ব্যক্তিত্বদের মাসিক চাঁদা দিয়েই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে করোনার মধ্যে আমরা অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। ধার-দেনা হয়ে যশোর শহরের আদ-দ্বীন হাসপাতাল সংলগ্ন স্বজন সংঘের অফিসের ভাড়াটি দিয়ে যাচ্ছি। তারপরও সারাক্ষণ আমরা অপেক্ষায় থাকি। খবর পেলেই আমরা চলে যায়। রোগীর ঠিকানা নিয়ে পৌঁছে যায় হাসপাতালে। রক্ত দিয়ে ফিরি হাসিমুখে।

সম্প্রতি রক্ত দেওয়া সেলিম হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী জানান, রক্ত দেওয়ার পূর্বে রোগীর স্বজনরা খোঁজ খবর নেয়। তবে, রক্ত দেওয়ার পরে কেমন আছে, বাসায় পৌছাতে পারলো কিনা সেটাও একবার খোঁজ নিয়ে দেখে না। তারপরও কেউ রক্তের প্রয়োজনে ফোন দিলে বিবেকের তাড়নায় রক্ত দিয়ে থাকি।
যশোর ব্লাড ব্যাংকের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ হোসেন বলেন, আমরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করি। ঝড়-বৃষ্টি বা এই মহামারি করোনার মধ্যেও আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। অনেক সময় গভীর রাতে অনেকে রক্তের জন্য ফোন করেন। তখন রক্তদাতা সংগ্রহ করে দিতে হয়। রক্ত পাওয়ার পর রোগীকে যখন সুস্থ হতে দেখি, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এম এম কলেজের আহ্বানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খান জাহান আলী শান্ত বলেন, যশোরে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে। তার মধ্যে রক্ত নিয়ে কাজ করে কম। সরকারি এম এম কলেজে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আহ্বান কোন ব্যক্তির রক্ত প্রয়োজন হলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে থাকি। কোন গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন সেটা জেনে সংগঠনের সদস্যকে পাঠিয়ে রক্তের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি। আহ্বান মূলত রক্তের কোন সংগঠন না হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে টিউশন ও হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের পার্টটাইম চাকুরির ব্যবস্থাও করে থাকে।

এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহিন বলেন, কয়েক বছর আগেও রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলেই শঙ্কা জেকে বসতো স্বজনদের মনে; কোথায় মিলবে রক্ত। অনেকেই ধরণা দিতেন পেশাদার রক্তাদাতাদের কাছে। টাকা দিয়ে কেনা রক্ত রোগীর শরীরে দিয়ে সাময়িক প্রয়োজন মিটলেও ভর করত আরেক দুশ্চিন্তা। রক্ত নিয়ে দুশ্চিন্তার সময় এখন অতীত।

শেয়ার