বাগেরহাটের সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দূর্নীতির অভিযোগ, তদন্ত শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বাগেরহাটের সাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: কবির উদ্দিন বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে অর্ধকোটিরও অধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরকে ঘিরে কবির উদ্দিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি দূর্নীতিবাজ চক্র তাকে এই ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে সহযোগীতা করেছে। এ বিষয়ে জেলার মোরেলগঞ্জ, রামপালসহ বিভিন্ন উপজেলার একাধিক শিক্ষক, মিডিয়া কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মন্ত্রনালয়ের সচিব, বিভাগীয় উপপরিচালক ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন। সূত্রমতে সম্প্রতি তিনি বদলী হয়ে যাওয়ার পর তার অনিয়ম দূর্নীতিতে সহযোগীতাকারী এবং সুবিধাভোগী বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নাম বেরিয়ে আসছে। এছাড়া কবির উদ্দিন বাগেরহাট থেকে বদলী হলেও তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অনিয়ম ও দূর্নীতিবাজ চক্র এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যেই সাবেক এই জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনিয়ম ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে সরকারের প্রথিমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নবুয়াত হোসেন সরকার বাগেরহাটে এসে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে গেছেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সব উপজেলায় না যাওয়া এবং সবার সাথে কথা না বলায় ক্ষোভ জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন অনিয়ম-দূর্নীতির সত্যতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনারয়ের সচিবের কাছে দেয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, জেলা শিক্ষা অফিসার মো: কবির উদ্দিন বাগেরহাটে থাকাকালে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে মোরেলগঞ্জ উপজেলায় ২০১৯-২০ সালের ৫০টি সাবক্লাসটার প্রশিক্ষন (দ্বিতীয় পর্যায়) না করিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচার করে বরাদ্দকৃত কয়েক লাখ টাকা আতœসাত করেন। একাজে তাকে মোরেলগঞ্জের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন সহায়তা করেছেন। তবে প্রশিক্ষণ না হওয়ায় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা অসীম কুমার সরকার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করে সরকারী কোষাগারে একলাখ ৫০হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন। এছাড়া স্কাউটিংয়ের নামে চিঠি দিয়ে জেলার একহাজার একশত স্কুল থেকে প্রায় আড়াইলাখ টাকা আদায় করে আতœসাত করেন। অন্যদিকে জেলার একহাজার একশত স্কুলে সরকারী নীতিমালা লংঘন করে স্লিপের টাকা থেকে শিক্ষকদের ৪৯লাখ ৫০হাজার টাকার বই কিনতে বাধ্য করে বিরাট অংকের কমিশন বাগিয়ে নিয়েছেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ থাকলেও দাপ্তরিক শাস্তি এবং দূর্নীতিবাজ চক্রের সহযোগী তৎকালীন সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম, সদরের সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাাকিম বিল্লাহ, প্রভাত কুমার হালদার, বিকাশ চন্দ্র, মুজিবর রহমান, মোরেলগঞ্জের উপজেলা শিক্ষা অফিসার জালাল উদ্দিন, শরণখোলার সহকারী শিক্ষা অফিসার বিধান কুমার, মংলা উপজেলা শিক্ষা অফিসার সুমন্ত পোদ্দার, সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহিনুর রহমান, মোল্লাহাটের উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো: কামাল হোসেনসহ দূর্নীতিবাজ অফিসারদের কারনে কেউ মুখ খুলতে পারেনি।
একইভাবে কবির উদ্দিন প্রতিটি উপজেলা থেকে ইনোভেশনের নামে দুই দফায় ৮হাজার টাকা করে প্রায় লাখ টাকা, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেওয়া পত্র ছাপার ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে প্রতিটি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে চারলাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে কচুয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিদ্যুৎ কুমার রায়, মোরেলগঞ্জের জালাল উদ্দিন, শরণখোলা শিক্ষা অফিসার মো: আশরাফুল ইসলাম ও সদরের শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলামসহ একটি চক্র দূর্নীতিতে সহায়তা করেছেন।

অন্যদিকে, বাগেরহাটে যোগদান করার পর থেকে নিজে অফিসের তৃতীয় তলায় ভিআইপি রেষ্ট হাউজে তিনটি কক্ষে বসবাস করলেও তিনি তার কোন ভাড়া সরকারী কোষাগারে জমা দেননি। উল্টো তিনি ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে কয়েক লাখ টাকা বাড়ীভাড়া উত্তোলন করে আতœসাত করেছেন। তার এ কাজে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রধান সহকারী আ: হালিম ও কর্মচারী রুহুল আমীন তাকে সহযোগীতা করেছেন। এছাড়া অফিস কম্পাউন্ডে সরকারীভাবে অনুমতি না নিয়ে বসবাসের জন্য পাকা ঘর তৈরী করেছেন। সেখানে অফিসের বিদ্যুত ও পানি ব্যবহার করে অন্যদের ভাড়া দিয়ে কয়েক লাখ টাকা আতœসাত করেছেন।

এদিকে সম্প্রতি এসব অভিযোগ পেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মোহাম্মদ মনসুরুল আলম একজন উপপরিচালককে বাগেরহাটের সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার কবির উদ্দিনের অনিয়ম ও দূর্নীতির তদন্তের নির্দেশ দেন। তার প্রেক্ষিতে উপপরিচালক মো: নবুয়াত হোসেন সরকার গত সোমবার বাগেরহাটে তদন্তে আসেন। এদিন তিনি জেলা শিক্ষা অফিসে কচুয়া, মোল্রাহাটসহ বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলেন। এছাড়া তিনি মোরেলগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেন। তিনি সেখান থেকে একাধিক ডকুমেন্ট সংগ্রহ ও সহকারী শিক্ষা অফিসারবৃন্দের বক্তব্য গ্রহন করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা নাবুয়াত হোসেন সরকার জানান, তিনি সরেজমিনে তদন্ত করতে বাগেরহাটে যান। তদন্তের কাজ চলছে। অভিযোগের সবকিছুই আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সব উপজেলাতে না গেলেও এবং সবার সাথে কথা না বললেও অভিযোগের সকল বিষয়ে খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তবে তিনি তদন্তে গাফিলতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে অভিযোগ সম্পর্কে সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কবির উদ্দিন জানান, যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সবই মিথ্যা। তবে যেহেতু তদন্ত চলছে তাই তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে, কবির উদ্দিনের ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে সহযোগী হিসেবে যারা কাজ করেছেন তারা এখনও বহাল তবিয়তে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসারের সহযোগীতার বিষয়ে বাগেরহাট সদরের সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাকিম বিল্লাহ জানান, তদন্ত কর্মকর্তা তাকে কোন কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি। তিনি সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসারের ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির কাজে জড়িত নন। জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের কাছে বই এসেছিল তারা সেই বইগুলো শিক্ষকদের কাছে বিক্রি করেছেন। আর টাকা আতœসাত ও কমিশন বানিজ্যের বিষয়ে তার জানা নেই। সহকারী শিক্ষা অফিসার প্রভাত হালদার জানান, জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশেই তিনি কাজ করেছেন। সেখানে অনিয়ম ও দূর্নীতি হলে তার দায়িত্ব তার নেই। সহকারী শিক্ষা অফিসার বিকাশ চন্দ্র জানান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দেয়ার বিষয়ে ভুয়া বিল ভাউচার করে টাকা আতœসাত করার বিষয়ে তিনি জানেন না। তবে তিনি এরকম পত্র দিতেও দেখেননি। শরনখোলার সহকারী শিক্ষা অফিসার বিধান চন্দ্র রায় জানান, তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসারের কথা অনুযায়ী কাজ করেছেন। এছাড়া শরনখোলায় সাবক্লাসটারের প্রশিক্ষণ হয়েছে তবে সবগুলো হয়েছে কিনা বা অনিয়ম হয়েছে কিনা তা উপজেলা শিক্ষা অফিসার আশরাফুল ইসলাম বলতে পারবেন। আমি যাকিছু করেছি তার পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুসারেই করেছি। এ বিষয়ে মংলা উপজেলা শিক্ষা অফিসার সুমন্ত পোদ্দার জানান, বিভিন্ন সময়ে জেলা শিক্ষা অফিসারকে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী শিক্ষা অফিসাররা সহায়তা করেছেন। কিন্তু সেটি কি বাবদ নিয়েছেন তা তিনি জানেন না। এছাড়া ইনোভেশনের কোন কাজই হয়নি বলে তিনি জানান।

এদিকে, অভিযোগকারী মোরেলগঞ্জের মো: নাসির উদ্দিন ও শামীম মল্লিক এবং রামপালের বেলায়েত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার কবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে সুনিদিষ্ট অভিযোগ দিলেও অধিদপ্তরের তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিচালক নাবুয়াত হোসেন সরকার সহযোগী ও অভিযোগকারীদের কোন বক্তব্য না নিয়েই চলে গেছেন। তিনি তদন্তে অবহেলা করেছেন বলে দাবী করেন অভিযোগকারীরা। এ বিষয়ে তারা মহাপরিচালক ও মন্ত্রনালয়ের সচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেয়ার