পেশা হারিয়ে

আমাদের দেশে নিজের পছন্দমতো পেশা গ্রহণ করার সুযোগ খুবই কম। পরিস্থিতি, পরিবেশসহ নানা কিছু কাজ করে কাউকে একটি পেশা গ্রহণ করতে। তা ছাড়া বেকারত্বের যন্ত্রণা প্রায় অধিকাংশ জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ওই দুর্বিষহ জীবনের তাড়নায় সে তখন সামনে যা পায় তা-ই আঁকড়ে ধরে। অনেকটা খড়কুটো ধরে বাঁচার মতো। তারপরেও মানুষের মন বড় অদ্ভুত। তা পানি নয়, তার নিজস্ব আকার আছে। প্রতিটি মনের ভেতর জানা ও অজানা স্তরে ভালোবাসাগুলো এক অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকে। শত প্রতিকূলতায়, শত কষ্টের মধ্যে পড়েও মানুষ ভালোবাসা ছাড়া খুব কম কাজই করে। বেকারত্বের দুর্বিষহতা কাটিয়ে কোনো তরুণ-তরুণী তাই যখনই কোনো খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরার সুযোগ পায়, সে তখন স্বাভাবিকই অনেক ভালোবাসা দিয়ে ওই কাজটি করে। তাই সেটা যত কম পারিশ্রমিকের হোক না কেন। আর তারপর একপর্যায়ে সে নিজেকে ওই পেশারই একজন করে গড়ে তোলে। আমাদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলেগুলোর শিক্ষকরাও এর বাইরে নন। অতি সামান্য বেতনেই তারা কাজ করেন। তারপরে একঝাঁক ফুলের মতো বাচ্চাকে নিয়ে সারা দিন কাটাতে কাটাতে তারা ওই বাচ্চাদের অভিভাবক হয়ে যান। তারা হয়তো উন্নত দেশের মতো শিক্ষা ওই শিশুদের দিতে পারেন না। সেই ট্রেনিং তাদের নেই। আবার আমাদের কিন্ডারগার্টেনগুলোর সেই লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার ক্ষমতাও নেই। তারপরেও এই দরিদ্র দেশে অনেক কিছুতে আমরা যেমন নাকের চিন্তা করি না, শুধু শ্বাস নিতে পারলে খুশি হই, এখানেও ঠিক তেমনি। আমাদের জনঘনত্বপূর্ণ এই ঢাকা শহরে, এমনকি কয়েকটি বিভাগীয় শহরে যদি এই কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো না থাকত, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সত্যিই সংকটে পড়তাম। তাই এই স্কুলগুলো যারা চালান এবং এখানে যারা শিক্ষকতা করেন, তারাও নীরবে অবদান রেখে যাচ্ছেন রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য। অতি স্বল্প আয় বা রোজগারের জীবন মেনে নিয়ে।

এ জীবনকে মেনে নেয়া মানুষগুলো কোভিডকালে এখন কূলহীন সাগরে পড়ে গেছেন। তারা কেউই স্কুল থেকে কোনো আয় করতে পারছেন না। এমনকি শিক্ষকরা বাড়তি সময়ে ছাত্রদেরও পড়াতে পারছেন না। তাই তাদের প্রত্যেকের ঘরে নেমে এসেছে দুর্বিষহ অভাব। নিজ পেশা হারিয়ে রাস্তার ধারের ফল দোকানি থেকে শুরু করে কাউকে কাউকে এখন স্কুটারচালক হতে হচ্ছে বেঁচে থাকার তাগিদে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পরে এভাবে ফল বিক্রেতা বা স্কুটারচালক হওয়া যে একটি মনের ওপর কী নির্মম অত্যাচার বা আঘাত, তা কোনো ভাষা দিয়ে প্রকাশ করার নয়। তবু পিতা-মাতাও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের এ কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু সে কাজে তো তারা অভিজ্ঞ নন। সেভাবে গড়ে তোলেননি নিজেকে। তাই সেখান থেকে তারা বেঁচে থাকার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। আবার তাদের স্কুলগুলো সরকারের কাছে ওইভাবে স্বীকৃতও নয়। কোনো প্রণোদনাও পৌঁছেনি তাদের কাছে। যে কারণে পেশা হারিয়ে এসব মানুষ পড়ে গেছেন অতল সাগরে। বাস্তবে কি এই মানুষগুলোকে এই অথৈ সাগর থেকে সম্পূর্ণ উদ্ধার না হোক, কিছুটা হলেও তাদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই! তাদের জন্য কিছু না কিছু তো করতেই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ধনী মানুষদের।

শেয়ার