মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের নামে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর সদর উপজেলার ঘোপগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের নামে সাড়ে ১৯ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন পদে আরও ৭১ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চাকরিপ্রার্থী অনেকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। বগুড়ার আবদুল মান্নান সরকার নামে এক ব্যক্তি সারাদেশে অন্তত ৭২টি মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অনুমোদন দিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই এইসব প্রতিষ্ঠানের জনবল নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করায় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে দাবি করে মঙ্গলবার যশোরে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার রাজেক আহমেদ ও ভুক্তভোগীরা।
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা রাজেক আহমেদ অভিযোগ করেন, বগুড়ার আবদুল মান্নান সরকার নামে এক ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ অনুমোদন ও নিয়োগের নামে প্রতারণা করছে। যশোর সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের ঘোপ গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিয়ে নূর মোহাম্মদের কাছ থেকে ১২ লাখ, উপধ্যক্ষ পদে সুজয় কুমার সুর’র কাছ থেকে ৫ লাখ ও প্রধান শিক্ষক পদে দিগন্ত হরি’র কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়েছেন। একটি প্রতিষ্ঠানে তিনটি পদে সাড়ে ১৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের ওয়েব সাইটের তথ্য মতে, ইতোমধ্যে যশোরে সাতটিসহ সারাদেশে অন্তত ৭২টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অনুমোদন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে আবদুল মান্নান সরকার। সেই হিসেবে সারাদেশে ৭২টি স্কুল এন্ড কলেজে তিনটি পদে ১৪ কোটি টাকার বেশি নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে ৭১ জন করে নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। স্থানীয় সরলমনা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা কমিটিতে রেখে মূলত জামায়াত শিবিরের লোক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নামে টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে নিয়োগ বাণিজ্য করছে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। বগুড়ার এই আবদুল মান্নান সরকার স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্রের বিশ^াসযোগ্যতা দেখাতে তিনি অনুলিপি হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সচিব ও তাদের একান্ত সচিবদের অনুলিপি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করছেন। এটাও তার প্রতারণা।
রাজেক আহমেদ বলেন, বগুড়ার আবদুল মান্নান সরকার মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য খুলনা বিভাগের সমন্বয় দায়িত্ব দিয়েছেন নিষিদ্ধ জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা নড়াইলের তুলারামপুর গ্রামের জামশেদ খানের ছেলে রওশন আলমকে। তার নামে অন্তত ১১টি জ¦ালাও পোড়াও এবং বিস্ফোরক ও অর্থআত্মসাতের মামলা রয়েছে। এই রওশন আলমের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় একটি টিনের চালা ঘর তুলে সেখানে ৭১ জন জনবল নিয়োগ দেয়া হবে বলে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছে। রওশন আলমের সহযোগী হিসেবে রয়েছে তার খালাত ভাই, যশোর সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের ঘোপ গ্রামের ইদ্রিস আলম, লাভলু সরকার, আবদুল হামিদ, মহসিন আলী ও তোফায়ালে আহমেদ। অপরদিকে মণিরামপুরে চালকিডাঙ্গায় মুক্তিযোদ্ধ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শান্তি কমিটির সভাপতির দুই ছেলেকে ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ওলিয়ার রহমান ও উপাধ্যক্ষ সামছুল আলমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওলিয়ার রহমান ওই কলেজে চাকরি প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা নাম ব্যবহার করে এই চক্রটি বাণিজ্য করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে যেহেতু অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে দেশের প্রত্যেক উপজেলায় মানুষের রোষানলে পড়বেন ও হেয়প্রতিপন্ন হবে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই এই অপতৎপরতায় লিপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী চক্র।
তিনি বলেন, প্রতারণার বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে অবহিত করেছি। তিনি বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের কোন অনুমোদন নেই। এটি ভূয়া।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ বলেন, চাকরি বয়স শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখানে ৩৫ বছর বয়সে আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়। এজন্য ১২ লাখ টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছি। পরে নিশ্চিত হয়েছি আমি প্রতারণার শিকার। ধার করে টাকা দিয়েছিলাম। পাওনাদারা টাকা চাচ্ছে। আমি খুব বিপাকে আছি।
উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়া সুজয় কুমার সুর বলেন, প্রথমে বুঝতে পারিনি প্রতারণা শিকার হচ্ছি। ৫ লাখ টাকা দিয়ে পথে বসার উপক্রম।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি, আফজাল হোসেন দোদুল, আইনুল হক প্রমুখ।

শেয়ার