দুর্নীতির মামলায় যশোর হিসাবরক্ষণ অফিসের সাবেক অডিটরকে ৮ বছর ও স্ত্রীর ৭ বছরের কারাদন্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পৃথক দুর্নীতির মামলায় যশোর জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসের সাবেক অডিটর গোলাম রসুলকে ৮ বছর এবং তার স্ত্রী আয়শা খাতুনকে ৭ বছরের কারাদ- ও অর্থদন্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার স্পেশাল জজ (জেলা ও দায়রা জজ) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সামছুল হক এই রায় দিয়েছেন। আসামিরা হলেন, মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মৃত মোবারক আলী সরদারের ছেলে যশোর শহরের পূর্ব বারান্দীপাড়ার বাসিন্দা গোলাম রসুল ও তার স্ত্রী আয়েশা খাতুন। দ-প্রাপ্ত গোলাম রসুল বর্তমানে ঢাকার সেগুন বাগিচার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের পিএ-৫ শাখার অডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। সরকার পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন দুদকের স্পেশাল পিপি জিএম জুলফিকার আলী এবং আসামি পক্ষে দেবাশীষ দাস।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, গোলাম রসুল ১৯৯৭ সালে যশোর জেলা হিসাব রক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর হিসেবে চাকরি করতেন। ওই সময়ে যশোর শহরের পূর্ব বারান্দীপাড়া স্বামী-স্ত্রীর নামে ১০ দশমিক ১০ শতক জমি ক্রয় করেন। ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে তারা এ জমিতে একটি তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটি নির্মাণে তাদের ব্যয় হয় ৬৪ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৯৪ টাকা। সেহেতু ওই জমি ও বাড়ির অর্ধেক ৫ দশমিক ৫ শতক জমির মালিক তার স্ত্রী আয়েশা খাতুন। আয়েশা খাতুন ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাপ্ত নোটিশের জবাবে তার আয় ও বাড়ি নির্মাণে ব্যয় দেখিয়েছেন ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিষয়ি দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত কার্যালয় যশোর তদন্ত শুরু করে। এর পরে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী দিয়ে বাড়ি নির্মাণের খরচ নিরূপন করা হয়। বাড়ি নির্মাণে এবং আয়েশা খাতুনের সম্পদের হিসাব বিবরণীতে ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৬৮ টাকা ৫০ পয়সার সম্পত্তি গোপন করেন।
এব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন যশোরের সহকারী পরিচালক আমিনুর রহমান বাদী হয়ে ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওই মামলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল আয়েশা খাতুনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা।
অপরদিকে, গোলাম রসুল যশোরে চাকরিকালীন সময়ে তার স্ত্রী আয়েশা খাতুনের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ দশমিক ১০ শতক জমি ক্রয় করেন। যার মধ্যে তার নিজের অংশ ৫ দশমিক ৫ শতক। ওই জমিতে তারা যৌথভাবে তিনতলা একটি দালান নির্মাণ করেন। গোলাম রসুল তার সম্পদ বিবরণীতে তিনতলা বাড়ি নির্মাণের কথা উল্লেখ করে ব্যয় দেখান ২৭ লাখ ৬১ হাজার ৩৭৫ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে ও গণপূর্ত বিভাগকে দিয়ে নিরীক্ষণ করে ভবন নির্মাণ খরচ পাওয়া যায় ৬৪ লাখ ১৮ হাজার ৪৯৪ টাকা। অর্ধেক হিসেবে গোলাম রসুলের সম্পদ বিবরণীতে ৩২ লাখ ৯ হাজার ২৪৭ টাকা দেখানোর কথা। সে হিসেবে তিনি ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭২ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেছেন।
এছাড়া তিনি আয়কর নথিতে বাড়ি নির্মাণের ব্যয় ১৪ লাখ ১১ হাজার ৩৭৫ টাকাসহ সর্বমোট ২১ লাখ ৮৪ হাজার ৫শ’ টাকার হিসাব দেখিয়েছেন। দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে তার মোট ৩৭ লাখ ১৪ হাজার ১৮০ টাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। যার বিপরীতে তার কোনো ঋণ নেই। এতে তিনি ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৮০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।
এব্যাপারে দুদক যশোর সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আমিনুর রহমান বাদী হয়ে ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই কোতোয়ালি মডেল থানায় দুদক আইনে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট ওই মামলার আসামি গোলাম রসুলকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পৃথক ওই মামলার স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আসামি আয়েশা খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬(২) ধারায় ৩ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন বিচারক। জরিমানার টাকা অনাদায়ের তাকে আরো ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২০০৪ এর ২৭(১) ধারায় একই আসামি আয়শা খাতুনকে ৪ বছর সশ্রম কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন বিচারক। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকে আরো ৪ মাসের কারাদ-ের আদেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে জ্ঞাতআয় বার্হিভুত ১৯ লাখ২৩ হাজার ৫৬৮ টাকা ৫০ পয়সা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অপরদিকে আসামি গোলাম রসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬ (২) ধারায় ৩ বছর সশ্রম কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন বিচারক। জরিমানার টাকা অনাদায়ের তাকে আরো ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় ৫ বছর সশ্রম কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকে আরো ৪ মাসের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন বিচারক। একই সাথে জ্ঞাতআয় বার্হিভূত ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৮০ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত গোলাম রসুল ও তার স্ত্রী আয়েশা খাতুন বর্তমানে কারাগারে আটক আছে।

 

শেয়ার