যশোরে পুলিশ সুপারের প্রেসব্রিফিং
ভগ্নিপতির সঙ্গে স্ত্রীর পরকীয়ায় প্রাণ দিতে হলো মান্নাতকে, গ্রেপ্তার ৪

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান স্কেভেটর শ্রমিক ইসরাফিল হোসেন মান্নাত (৪২) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। গত শনিবার যশোর শহরের কারবালা এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, স্ত্রীর পরকীয়ার জের ধরে প্রাণ দিতে হয়েছে ইসরাফিল হোসেন মান্নাতকে (৪২)। মান্নাতের ভগ্নিপতি (ছোটবোনের স্বামী) শাহ আলমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তার স্ত্রী সুমির। সোমবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান যশোরের পুলিশ সুপার মুুহাম্মদ আশরাফ হোসেন। এই হত্যাকা-ে জড়িত অভিযোগে পুলিশ ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত পাইপ, ইট, মোবাইল ফোন এবং মোটরসাইকেলও উদ্ধার হয়েছে।
আটককৃতরা হলো, যশোর শহরের পুরাতন কসবা নান্টুর বাগান এলাকার আবু তাহেরের ছেলে রিফাত হোসেন (১৯), সদর উপজেলার মাহিদিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আল আমিন ওরফে গ্যারেজ আল আমিন (১৯), সুজলপুর গ্রামের আব্দুর রশিদ শেখের ছেলে রায়হান শেখ (২২) ও শফিকুল ইসলাম বাবুর ছেলে নয়ন হোসেন (২০)। চারজনই সোমবার আদালতে এই হত্যাকান্ড সম্পর্কে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম তাদের জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার জানান, গত ২৩ অক্টোবর রাতে বাইসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন স্কেভেটরের হেলপার ই¯্রাফিল হোসেন মান্নাত। রাতে আর বাড়িতে ফেরেননি তিনি। পরের দিন সকালে কারবালা এলাকার রাস্তার পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মা আনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জনের নামে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
মামলার আসামিরা হলো, শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়া এলাকার শফিয়ার রহমানের ছেলে এবং নিহতের ভগ্নিপতি শাহ আলম, শাহ আলমের ভাগ্নে ধর্মতলা এলাকার সলেমানের ছেলে শামীম হোসেন, নিহতের স্ত্রী বকচর চৌধুরী পাড়ার নজরুল ইসলামের মেয়ে শারমিন সুলতানা সুমি এবং সুমির মা সুফিয়া বেগম। মামলাটি বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন আরো জানান, মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে রোববার যশোর অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া এলাকার মামা বাড়ি থেকে হত্যায় জড়িত আল আমিনকে এবং যশোর শহরের চাঁচড়া চেকপোস্ট এলাকা থেকে রায়হান শেখ, রিফাত ও নয়ন হোসেনকে আটক করা হয়। পরে তাদের স্বীকারোক্তি মতে হত্যাকাজে ব্যবহৃত জিআই পাইপ, মোবাইল ফোন, একটি ইট ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। নিহত মান্নাতের ভগ্নিপতি শাহ আলমের সাথে তার স্ত্রী শারমিন সুলতানা সুমির সাথে পরকীয়া ছিলো। মান্নাত-সুমির সংসারে দুইটি সন্তান আছে। এছাড়া মান্নাতের বোন শরিফা-শাহ আলমের রয়েছে তিনটি সন্তান। স্কেভেটরসহ শাহ আলমের বেশ কয়েকটি গাড়ি আছে। শাহ আলমের সাথে সুমির পরকীয়ার ঘটনা জানতে পারে মান্নাত। এ নিয়ে তাদের সংসারে বিরোধ শুরু হয়। এই কারণে মাস তিনেক আগে সুমি গোপনে তালাক দেয় তার স্বামী মান্নাতকে। এরপর শাহ আলমকে বিয়ে করে তারা ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বাড়ি ভাড়া করে সেখানে বসবাস করতে থাকে। একদিকে স্ত্রী অন্যদিকে বোনের স্বামী। সে কারণে মান্নাত তার স্ত্রীকে খোঁজার এক পর্যায়ে কোটচাঁদপুরে তাদের সন্ধান পান। সেখানে গিয়ে মান্নাত জানতে পারেন শাহ আলমকে নিয়ে সংসার করছে সুমি। পরে সেখানকার স্থানীয় ইউপি মেম্বর ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে গত ২ অক্টোবর এক শালিসে একটি সুরাহ হয়। দেনমোহর খোরপোষসহ তিন লাখ টাকা নিয়ে ওই শালিসে সুমি তালাক দেন শাহ আলমকে। ফলে শাহ আলম আবার যশোরে ফিরে আসেন।
প্রেসব্রিফিং পুলিশ সুপার আরো বলেন, ২ অক্টোবর দিবাগত রাত তিনটার দিকে মান্নাতকে বকচর করিম পাম্পের সামনে বেশ কয়েকজন মারপিট করে। সে সময় তার চিৎকার আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে ৫/৬জনকে ধরে ফেলে এবং তাদের উল্টো মারপিট করে। মারপিটের শিকার হয় আটক ৪জনও। সে কারণে শাহ আলম ক্ষিপ্ত হয়ে মান্নাতকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।
এদিকে মান্নাতের বোন শরিফা বেগম পরিবারের সদস্যদের জানায়, শাহ আলম বাড়িতে ঠিকমতো আসে না। পরিবারের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখে না। শাহ আলম ফের সুমির সাথে যোগাযোগ আছে কিনা ? বিষয়টি মান্নাত খোঁজ খবর নেয়ার জন্য শাহ আলমের প্রাইভেটকার চালক আল আমিনকে কাজে লাগায়। আল আমিন রামনগর খাঁপাড়ার ছমেদ আলীর ছেলে। আল আমিন ও শাহ আলমকে সুযোগ খুঁজতে থাকে মান্নাতকে খুন করতে। গত ২৩ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মান্নাত বকচর বিহারী কলোনী এলাকার রয়েলের দোকানে চা পান করার সময় আল আমিন কথা আছে বলে মান্নাতকে ফোনে ডাকে। আল অমিন ডাকে মান্নাত বাইসাইকেল নিয়ে দড়াটানায় আসে। সেখানে আল আমিনের সাথে থাকা আরো মান্নাতের ৪/৫জনের কথা হয়। ওই কথাবলা দেখতে পায় মান্নাতের ছোট ভাই বাবর আলী। পরে মান্নাত বাইসাইকেলে করে এবং ওই ৪/৫জন একটি প্রাইভেটকারে করে কারবালার দিকে চলে যায়। কারবালা এলাকার সিঅ্যান্ডবি রোডের কৃষিবিদ শাহ আলমের বাড়ির সামনে ইট দিয়ে ও একটি জিআই পাইপ দিয়ে শাহ আলমকে পিটিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় আসামিরা।
পুলিশ সুপার বলেছেন, ওই হত্যাকা-ের সাথে ৭/৮জন জড়িত। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে। এই মামলার মূল আসামি শাহ আলম এবং সুমি পলাতক রয়েছে। সুমির কারণেই হত্যাকান্ডের সূত্রপাত।
তিনি বলেছেন, শাহ আলমের ড্রাইভার আলামিন পলাতক রয়েছে। তার ভূমিকায় এই হত্যাকা- ঘটেছে। তাকেও আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই শামিম হোসেন বলেছেন, আটক ৪ জনই সোমবার সন্ধ্যার দিকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলা, ক-সার্কেল গোলাম রব্বানী, জামাল আল নাসের, অপু সরোয়ার, সহকারী পুলিশ সুপার মণিরামপুর সার্কেল সোয়েব আহম্মেদ খান, ডিএসবির ডিআইওয়ান মশিউর রহমান, কোতোয়ালির ওসি মনিরুজ্জামান, ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মাসুম কাজী, এসআই মফিজুল ইসলাম ও শামিম হোসেন প্রমুখ।

শেয়ার