প্রেসিডেন্ট’স কাপের পাঁচ প্রাপ্তি

সমাজের কথা ডেস্ক॥ প্রাথমিক সূচিতে ছিল একটি তিন দিনের ম্যাচ। বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা সফর স্থগিত হওয়ার পর হুট করেই সিদ্ধান্ত হয় তিন দলের ওয়ানডে টুর্নামেন্ট আয়োজনের। দেশের সব শীর্ষ ক্রিকেটারের অংশগ্রহণ, প্রেসিডেন্ট’স কাপ নামকরণ, প্রাইজমানি আর ব্যক্তিগত পুরস্কারের ছড়াছাড়ি মিলিয়ে টুর্নামেন্টের ওজনও বেড়ে যায় বেশ। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও এই টুর্নামেন্ট সাড়া জাগিয়েছে বেশ।

মাহমুদউল্লাহ একাদশের শিরোপা জয় দিয়ে রোববার শেষ হয়েছে দুই সপ্তাহের এই আয়োজন। ক্রিকেটীয় মানে দারুণ কিছু ছিল না অবশ্যই, তবে সব পারিপার্শ্বিকতা মিলিয়ে ইতিবাচক অনেক কিছুই মিলেছে এই টুর্নামেন্ট থেকে।
করোনাভাইরাসের প্রকোপে পড়া লম্বা বিরতির পর ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরার শুরুটা হয়েছিল ব্যক্তিগত অনুশীলন দিয়ে। এরপর ছোট ছোট গ্রুপে ও পরে শুরু হয় দলগত অনুশীলন। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিসিবির ট্রেনিং পরিকল্পনা ছিল যথেষ্টই সময়োপযোগী। এরপর শ্রীলঙ্কা সফরের প্রস্তুতির জন্য দুটি দুই দিনের ম্যাচ আয়োজন করা হয় ক্রিকেটারদের দুই দলে ভাগ করে। লম্বা বিরতির পর ম্যাচে ফেরার শুরু ছিল ওই দুটি ম্যাচ দিয়ে।

তবে প্রতিযোগিতার ব্যাপার সেখানে ততটা ছিল না। প্রেসিডেন্ট’স কাপ দিয়ে সেই আবহও ফিরেছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও দেশের ক্রিকেট কার্যক্রম স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টায় এই টুর্নামেন্টকে পরীক্ষামূলক হিসেবে নিয়েছিল বিসিবি। সেই পরীক্ষা সফল হয়েছে যথেষ্টই।

রুবেলের আরেকটি সাফল্য, যে দৃশ্য দেখা গেছে নিয়মিতরুবেলের আরেকটি সাফল্য, যে দৃশ্য দেখা গেছে নিয়মিতজৈব-সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় যথেষ্ট সতর্কতার মধ্যেই টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এরপর বিসিবির দৃষ্টি আরেকটু বড় পরিসরের টুর্নামেন্টে। ৫ দলের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে, যেটি শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ১৫ নভেম্বর।
এভাবেই একটু একটু করে কঠিন এই সময়ের মোকাবেলা করার পরিকল্পনা করছে বোর্ড। এই টুর্নামেন্ট থেকে নিজেরাও বুঝতে পেরেছে, কোথায় আরও কাজ করতে হবে, কোথায় ঠিকঠাক আছে।
আগামী জানুয়ারিতে পূর্নাঙ্গ সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসার কথা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের। তার আগে ঘরোয়া এই টুর্নামেন্টগুলো সফলভাবে আয়োজন করতে পারলে ক্যারিবিয়ানদের সফরে আসার পথ সুগম হবে আরও। টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টটি ভালোভাবে শেষ হলে পরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনেরও পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে নিশ্চিতভাবেই।

লাইভ স্ট্রিমিং : ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলো উপভোগ করতে না পারা নিয়ে দেশের ক্রিকেট অনুসারীদের আক্ষে বহুদিনের। টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা বহুদূর, লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থাও থাকে না বেশির ভাগ সময়। গত দুই মৌসুমে অবশ্য গোটা দুই ক্যামেরা দিয়ে কিছু ম্যাচ স্ট্রিমিং করা হয়েছে। তবে প্রত্যাশা বরাবরই ছিল আরেকটি ভালো কিছুর। প্রেসিডেন্ট’স কাপে সেই আশা অনেকটাই মিটেছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বেশ কিছু ক্যামেরা দিয়ে সম্প্রচার করা হয়েছে টুর্নামেন্ট। তাতে ক্রিকেট অনুসারীদের মনের খোরাক যেমন মিটেছে, তেমনি বিসিবিও একটি ধারণা পেয়েছে যে মোটামুটি মানসম্পসত সম্প্রচার খুব কঠিন কিছু নয়। সামনেও তাই ঘরোয়া আসরগুলোয় এমন কিছুর আশা করাই যায়।

পেসারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স : মাঠের পারফরম্যান্সের দিক থেকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নিঃসন্দেহে পেসারদের পারফরম্যান্স। লম্বা বিরতির পর তাদের ফিটনেস যেমন দেখা গেছে দুর্দান্ত, তেমনি বোলিংও ছিল ক্ষুরধার। উইকেট ছিল মন্থর, তার পরও পেসাররা জ্বলে উঠেছেন দারুণভাবে।
১২ উইকেট নিয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছেন রুবেল হোসেন ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। তালিকায় এরপরও কেবল পেসাররাই। বাংলাদেশের একটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় প্রথম ৭ জনই পেসার, অভাবনীয় এই ব্যাপারটি প্রেসিডেন্ট’স কাপে দেখা গেছে।
তাসকিন আহমেদ নিজেকে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন এই আসরে, রুবেল ও মুস্তাফিজুর রহসান ফিরে পেয়েছেন যেন আগের গতি, ছন্দ ও ধার। আল আমিন হোসেন, ইবাদত হোসেন, আবু জায়েদ চৌধুরিও ভালো করেছেন। তরুণ সুমন খান ও শরিফুল ইসলাম মেলে ধরেছেন নিজেকে। সবারই ফিটনেস, গতি, আগ্রাসন ছিল চোখে পড়ার মতো।
ইরফান শুক্কুর : ঘরোয়া ক্রিকেটের বেশ পরিচিত নাম ইরফান শুক্কুর। মোটামুটি নিয়মিত পারফর্ম করেছেন, কিন্তু অসাধারণ কোনো মৌসুম কাটেনি কখনোই। নিজেকে পরের ধাপেও নিতে পারেননি সেভাবে। সেই ইরফানই এবার চমকে দিয়েছেন তার ব্যাটসম্যানশিপ দিয়ে।
এমনিতে টপ বা মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হলেও এই আসরে ৭ নম্বরে ব্যাট করার কঠিন কাজটি এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান করেছেন দারুণভাবে। চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে দলকে উদ্ধার করেছেন দারুণ দৃঢ়তায়, আবার প্রয়োজনে শেষের দাবি মিটিয়েছেন ঝড় তোলা ব্যাটিংয়ে। মুশফিকুর রহিমের চেয়ে রান কম করেও তাই টুর্নামেন্টের সেরা ব্যাটসম্যানের পুরস্কার পেয়েছেন ইরফানই।
তার শটের পরিধি, টেম্পারামেন্ট, পরিস্থিতি বুঝে খেলা, এসব ছিল নজরকাড়া। ঘরোয়া ক্রিকেটে বছর দশেক কাটানোর পর অবশেষে মনে হচ্ছে, পরের ধাপে নিজেকে নিতে শুরু করেছেন ২৭ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।

শান্তর নেতৃত্ব : মুশফিকুর রহিম নেতৃত্ব দিতে না চাওয়ায় আসরের একটি দলের অধিনায়ক করা হয় নাজমুল হোসেন শান্তকে। এর আগেও বাংলাদেশ ‘এ’ দল, বিসিবি একাদশ, ইমার্জিং দলকে তিনি নেতৃত্বে দিয়েছে নানা সময়ে। প্রেসিডেন্ট’স কাপের আগে দুটি দুই দিনের ম্যাচেও তিনি ছিলেন এক দলের অধিনায়ক। তার পরও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভীড়ে এরকম একটি আসরে তার নেতৃত্ব পাওয়া ছিল যথেষ্ট কৌতূহল জাগানিয়া।
টুর্নামেন্ট শেষে বলা যায়, শান্ত নেতৃত্বের পরীক্ষায় উতরে গেছেন। ফাইনালে পেরে না উঠলেও তারুণ নির্ভর দলটি ছিল প্রাথমিক পর্বের সফলতম দল। শান্তর বোলিং পরিবর্তন, মাঠ সাজানো, ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত, কতৃত্ব, সবই ছিল চোখে পড়ার মতো। হতাশার ব্যাপার একটিই, তার আসল কাজ যেটি, সেই ব্যাটিংয়ে ব্যর্থ হয়েছেন চরমভাবে। ৫ ম্যাচে তার মোট সংগ্রহ মোটে ৬৯।

শেয়ার