শহীদ আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু’র ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

 মণিরামপুরের চিনাটোলায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ আজ ২৩ অক্টোবর শুক্রবার পাঁচ শহীদ বিপ্লবী (কমরেড আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু)’র ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রয়াত বিপ্লবীদের মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও জাতীয় ছাত্রদল যশোর জেলা কমিটি আজ সকাল ১০টায় প্রয়াতদের সমাধিস্থল মণিরামপুরের চিনাটোলায় শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন, শোক নিরবতা পালন ও শপথ পাঠ করা হবে। সকালের কর্মসূচিতে মণিরামপুর ও কেশবপুরের নেতাকর্মীদের যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর (বাংলা ৬ কার্তিক) পাকিস্তানী শাসকদের এদেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন কমরেড আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু। যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজার সংলগ্ন গ্রাম থেকে রাজাকাররা গ্রেপ্তার করে বাজারের পাশের হরি নদীর ব্রিজের উপর এই পাঁচজনকে হত্যা করে পৈশাচিক উল্লাসে শহীদ বিপ্লবীদের মরদেহ নদীর জলে নিক্ষেপ করে।
পাঁচ শহীদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ঃ

শহীদ কমরেড আসাদ ঃ কমরেড আসাদউজ্জামান আসাদ ১৯৪৯ সালের ৬ জানুয়ারি যশোর শহরের খড়কি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহাদাত আলী, মাতা সাজেদা খাতুন। ৯ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ৪র্থ। ১৯৬৪ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাশ করে ভূগোলে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলনে অগ্রণী ও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। তিনি এম এম কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ও পরে ভিপি হিসেবে এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র রাজনীতিতে থাকাকালে তিনি শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-তে যোগদান করেন। তিনি যশোর রিক্সা চালক সমিতিরও সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭০ সালের দিকে পার্টি সভ্যপদ লাভ করেন এবং গ্রামাঞ্চলে পার্টির ডাকে কৃষকদের মধ্যে কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলা ৬ কার্তিক অপরাপর শহীদদের সাথে রাজাকারদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন।

শহীদ কমরেড শান্তি ঃ সিরাজুল ইসলাম শান্তি ১৯৪৫ সালে যশোর জেলার শার্শা উপজেলা সদরে মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা আছির উদ্দিন ও মাতা জোবেদা খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। বড় ভাই অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, মেজো ভাই নজরুল ইসলাম জীবিত ও একমাত্র বোন পেয়ারা খাতুন প্রয়াত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তার পিতা চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের বনগাঁ মহাকুমা ছেড়ে বিনিময় সূত্রে যশোর শহরের ষষ্ঠীতলা পাড়াস্থ পিটিআই রোডে বসবাস শুরু করেন।শান্তি যশোর জিলা স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। প্রচলিত ধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চেয়ে সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত বই পড়ার প্রতি ছিল তার প্রচন্ড ঝোঁক। সংগত কারণে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার ছিল প্রগাঢ় সম্পর্ক। ১৯৬২ সালের দিকে তার সাথে যশোরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ হয় এবং পর্যায়ক্রমে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পার্টিসভ্য পদ লাভ করেন এবং ওই বছরেই আত্মগোপন করেন। তিনি যশোর জেলা কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্বও পালন করেন। ১৯৬৯-৭০ সালের কৃষক আন্দোলনের সাথে তিনি ঘনিষ্টভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

শহীদ কমরেড মানিক ঃ আহসান উদ্দিন মানিক পিতা আফাজ উদ্দিন। তিনি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার তোলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। পিতার চাকুরির সুবাদে তারা যশোর শহরের ডিসি বাংলো রোডে নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করতেন। বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যরা কুষ্টিয়া শহরে বসবাস করেন। বাবা ছিলেন ফুড ইন্সপেক্টর। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল আনুমানিক ২৪ বছর। কমঃ মানিক ১৯৬৪ সালে যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। মানিক যশোর জেলার প্রায় সর্বত্রই তার অপর ছাত্র নেতা বন্ধুদের সাথ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রদের নিয়ে ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে জেলার ছাত্র সমাজের অন্যতম নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের যশোর জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। এ সময় অর্থাৎ ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি কিছু দিনের মধ্যেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)’র গ্রুপভূক্ত হন। ১৯৭০ সালে পার্টি সভ্যপদ লাভ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে বিপ্লবের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

শহীদ কমরেড তোজো ঃ কমরেড মাশুকুর রহমান তোজো ১৯৪২ সালের ৩১ জানুয়ারি যশোর শহরের ষষ্ঠীতলা পাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা এ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান, মাতা করিমা। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়। তার ছোট ভাই খালেদুর রহমান যশোর সদর-৩ আসনের সাবেক এমপি। কমরেড তোজো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯৫৬ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫৮ সালে যশোর এম.এম. কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেক পদার্থ বিদ্যা ও গণিতশাস্ত্রে কৃতিত্বের সাথে সম্মান শ্রেণি পাশ করেন। পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ যান। রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণের তাগিদ অনুভব করে সেখানে (লন্ডন, একচুয়ালি ডিগ্রি) শিক্ষা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ১৯৬৯ সালের দিকে হোমল্যান্ড বীমা কোম্পানীতে যোগদান করেন। দেশে ফিরে প্রথমে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এর সাথে যুক্ত হলেও ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক সচেতনা এবং প্রয়োগিক উপলব্ধি বোধের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) তে যোগ দেন। পার্টিতে যোগ দেওয়ার পূর্বে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তিনি পাক আর্মির হাতে গ্রেফতার এবং নির্যাতনের শিকার হন, এক পর্যায়ে ছাড়া পান। এরপর তিনি গ্রামে সার্বক্ষণিক পার্টির কর্মী হিসেবে কৃষকদের সাথে একাকার হয়ে যান। কমঃ তোজোর মধ্যে কোন কৃত্রিমতার ছাপ ছিল না।

শহীদ কমরেড ফজলু ঃ ফজলু দফাদার যশোর জেলার মণিরামপুর থানার গোপালপুর গ্রামে এক নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা রজব আলী দফাদার ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, মাতা নুরজাহান। তিনি ৬ ভাই ৫ বোনের মধ্যে সকলের বড় ছিলেন। অবশ্য তার বাবার ২য় স্ত্রী ছিল। যার নাম আমেনা বেগম। তিনি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণি এবং জুনিয়র হাই স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দেশে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হলে ফজলু সেনাবাহিনী ত্যাগ করে গ্রামে ফিরে এসে এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি সিপিইপি (এম-এল)এর নেতৃত্বে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন।

 

 

শেয়ার