যশোরের মণিরামপুরে জোড়া হত্যাকাণ্ড ॥ আহাদকে শিক্ষা দিতে গিয়ে খুন হয় বাদল হামলায় মরলো আহাদও, আটক ১

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরের মণিরামপুরে আলোচিত দুই হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ‘মেয়েলি ঘটনা’ ফাঁস করার হুমকি দেয়ায় আহাদকে হত্যার পরিকল্পনা করে বাদল। আহাদকে খুন করতে গিয়ে উল্টো তার হাতেই খুন হয় বাদল। এই হামলায় আহাদ গুরুতর জখম হলে তাকে খুন করে বাদলের বন্ধু মানিক। মানিককে আটক করে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করেছে বলে বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তথ্য জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন। আর এই মানিকের জড়িত থাকা ও আটকের বিষয়ে আগেই খবর প্রকাশ করে দৈনিক সমাজের কথা। এদিকে, বৃহস্পতিবার মানিককে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মণিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামে বাদল হোসেন (২২) ও আহাদ মোল্লা (২৫) খুন হন। নিহত বাদল যশোর সদর উপজেলার জয়ন্তা গ্রামের আক্তার গাজী ওরফে আকু গাজীর ছেলে ও একই এলাকার লোকমান হোসেন মোল্যা ওরফে নেকমালের ছেলে আহাদ মোল্যা। ওইদিন রাতে নিহত বাদল হোসেনের মা আঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে মণিরামপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।
গ্রেফতারকৃত আসামি জাহিদ হাসান মানিক (২৩) সদর উপজেলার চাউলিয়া গ্রামের গ্যাসফিল্ড এলাকার চাঁন মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় একজন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর জাহিদ হাসান মানিককে গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে ঘটনাস্থলের আধা কিলোমিটার দূরে মোশারফ হোসেন টুকু মেম্বরের পুকুরের পানির ভিতর থেকে ভিকটিম বাদল হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থলের পশ্চিমপাশের আলতাফ হোসেনের ধানি জমি থেকে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত বার্মিজ চাকু উদ্ধার করা হয়েছে।
জাহিদ হাসান মানিকের তথ্যমতে, সে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহী করে। মোটরসাইকেল ভাড়া দিতে দিতে বাদল হোসেনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বাদল হোসেনের একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে। বিষয়টি জেনে যায় প্রতিবেশি আহাদ মোল্যা। সে এই বিষয়টি বাদলের বাবা মাকে বলে দেয়ার হুমকি দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাদল পরিকল্পনা করে আহাদকে উচিত শিক্ষা দিবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধু জাহিদ হাসান মানিকের সহযোগিতা চায়।
ঘটনার দিন বিকেলে বাদল ও মানিক মোটরসাইকেল নিয়ে যায় আহাদের কাছে। আহাদকে নিয়ে তারা তিনজন একই মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল বাদল, মাঝখানে বসেছিল আহাদ আর পিছনে বসা ছিল মানিক। এরমধ্যে বাদল তার ফোনের স্কিনশট দেখায় মানিককে। তাতে লেখা ছিল বলরামপুর গিয়ে মানিক ড্রাইভিং করবে, আর পিছনে বসবে বাদল। আর এই সেই লোক (আহাদ) যাকে বাদল উচিত শিক্ষা দিবে।
বলরামপুর পৌঁছে মানিক মোটরসাইকেল ড্রাইভিং শুরু করে। আর পিছনে বসে বাদল। এক পর্যায়ে বাদলের পকেটে থাকা বার্মিজ চাকু বের করে আহাদের গলায় পোচ মেরে দেয়। আহাদ তখন বাদলের হাতসহ চাকু ধরে ফেলে উল্টো বাদলকে আঘাত করে। চড়ন্ত মোটরসাইকেলে তারা ধস্তাধস্তি শুরু করে দেয়। এসময় মানিক মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায়। এসময় আহাদ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিছু দুরে গেলেই পা পিছলে আহাদ মাটিতে পড়ে যায়। এসময় আহাদ তার বুকের উপর বসে গলায় ছুরি দিয়ে জবাই করে। এরপর আহাদ আবার ফিরে মোটরসাইকেলের কাছে আসে। এর আগে মানিকও ভয়ে একটু দূরে পালিয়ে যায়। কিন্তু আহাদ কাছে এসে মোটরসাইকেলের লাইট বন্ধ করে দেয়ার পরই মাটিতে পড়ে যায়। তখন মানিক এসে ছুরি নিয়ে আহাদকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। এরপর সেই ছুরি পাশের ধান ক্ষেতে ফেলে দেয়। আরও মোটরসাইকেলে মোবাইলের স্কিনশর্ট দেখানোর সময় বাদলের মোবাইল ফোন মানিকের পকেটে থেকে যায়। এরইমধ্যে রিং বেজে ওঠায় ভয় পেয়ে যায় সে। এক পর্যায়ে বাদলের মোবাইল ফোন পুুকুরের মধ্যে ফেলে দেয় মানিক। এদিকে বৃহস্পতিবার আটক মানিকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। বিচারক তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
পুলিশ সুপার বলেন, আসামি মানিককে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে বৃহস্পতিবার যশোর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করেন তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম। বিচারক মঞ্জুরুল ইসলাম মানিককে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনি আরো বলেন তদন্তে আর কারোও সংশ্লিষ্টতা পেলে কিংবা নতুন কোন মোড় নিলে সেটি যুক্ত করে পুলিশ প্রতিবেদন দেয়া হবে।
প্রেসবিফ্রিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সালাহউদ্দিন শিকদার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রব্বানি শেখ, মনিরামপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সোয়েব আহমেদ খান, পুলিশ পরিদর্শক (ডিএসবি) মশিউর রহমান, ডিবি ওসি সোমেন দাস, এসআই মফিজুল ইসলাম ও এসআই শামিম হোসেন প্রমুখ।

 

 

শেয়ার