অভিভাবকদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর
নভেম্বরেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে না মাধ্যমিকে হচ্ছে না বার্ষিক পরীক্ষা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এবার বার্ষিক পরীক্ষা না নিয়েই মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ওপরের শ্রেণিতে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। পাশাপাশি আগামী নভেম্বর মাসেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে না বলে ধারণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “কোনো পরীক্ষা নয়, এবারের যে পরিস্থিতি, কোনো পরীক্ষা নয়। এবার কোনো বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না।”

তবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ঘাটতি পূরণের জন্য ৩০ কর্মদিবসে শেষ করা যায় এমন একটি সিলেবাস এনসিটিবি প্রণয়ন করেছে। ওই সিলেবাসের আলোকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সপ্তাহে একটি করে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। সেই অ্যাসাইনমেন্টের মূল্যায়ন করে শিক্ষার্থীদের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী ক্লাসে তা পূরণের চেষ্টা করা হবে।

শিক্ষার্থীদের পরের ক্লাসে ওঠার ক্ষেত্রে অ্যাসাইনমেন্টের মূল্যায়নের যে কোনো প্রভাব থাকবে না, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দীপু মনি বলেন, “এই মূল্যায়নটার মাধ্যমে যেন কোনো চাপ সৃষ্টি করা না হয়। এই মূল্যায়ন শুধুমাত্র আমাদের বোঝার জন্য যে শিক্ষার্থীদের কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে, সেগুলো পরের ক্লাসে কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করব।”

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে আগামী নভেম্বর মাসেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে না বলে ধারণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।

নভেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যাবে কি না, সেই প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আপনাদের কী মনে হয়? এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-যেখানে যেখানে খুলেছিল অধিকাংশ জায়গায় সেখানে বন্ধ করার পর্যায়ে আছে।
“যেহেতু শীতকাল নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা আছে সব জায়গায়, বিশেষজ্ঞ মহলও বলছে। সে কারণে আমাদের কোভিড বিষয়ক যে জাতীয় পরামর্শক কমিটি রয়েছে আমরা তাদের সাথেও আলাপ-আলোচনা করব।”
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা যখন মনে করব যে আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই বা খুবই সামান্য, হয়তো বা যে রিস্কটুকু নেওয়া সম্ভব, সে রকম একটা অবস্থায় যদি যায়, তখন আমরা খুলতে পারব। সেটি কবে হবে সেটি আমাদের কারো পক্ষেই এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।”
এদিকে, মহামারীর এই সময়ে যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা চাকরি হারিয়েছেন তাদের কাছ থেকে সন্তানের টিউশন ফি আদায়ের ক্ষেত্রে মানবিক আচরণ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “যারা চাকরি হারিয়েছেন বা আয়-রোজগার হারিয়েছেন তাদেরকে বলব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানবিক আচরণ করবেন এবং তাদেরকে যতটা সম্ভব ছাড় দেওয়া, না হলে কিস্তিতে টিউশন ফি পরিশোধ করাসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে।
“উভয় পক্ষকে আন্তরিকতার সঙ্গে সন্তানদের শিক্ষা চালিয়ে নেবার জন্য নিজেদের সামর্থ মতো যা কিছু করা সম্ভব তা করার জন্য বার বার আমি আহ্বান জানাচ্ছি, আমি আবারও জানাব। আমাদের সন্তানদের যেমন শিক্ষা চালিয়ে নিতে হবে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালু রাখতে হবে, আমাদের শিক্ষকদেরও জীবন-জীবিকার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কাজেই ঢালাওভাবে বেতন বাদ দিয়ে দেওয়া বা এখন বেতন দেওয়া হবে না, এ জাতীয় কোনো সিদ্ধান্ত একেবারেই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না।”

দীপু মনি বলেন, “টিউশন ফি শিক্ষার্থীদের দেওয়ার কথা, স্কুল তো চলতে হবে। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বার বার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলেছি, অভিভাবকদেরও বলেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে তার মানে এই নয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খরচ বন্ধ আছে।

“কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি দিতে হচ্ছে। বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও যেসব খরচ আছে- শুধু হয়তো প্রতিদিনকার বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল লাগছে না কিন্তু আরও বহু খরচ তাদের লাগছে। সকলেই যেহেতু অনলাইনে ক্লাস করাচ্ছে সেক্ষেত্রেও তাদের অতিরিক্ত কিছু খরচ হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চলতে হবে। কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বিরাট সমস্যা তৈরি হবে। এরকম হয়ে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সমস্যা হবে। কাজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চালু রাখতে হবে শিক্ষকদেরও জীবন-জীবিকা চালিয়ে নিতে হবে। তাদেরও তো পরিবার রয়েছে, তাদেরও তো আয়-রোজগারের বিষয়টি রয়েছে।”

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা খুবই বিপদে পড়েছেন, যারা সরকারি চাকরিজীবী অভিভাবক তাদের তো আয়-রোজগারের কোনো সমস্যা হয় নাই। যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত আছেন এবং বেতন পাচ্ছেন তাদেরও সমস্যা নাই। সমস্যা হচ্ছে যারা হয়তো চাকরি হারিয়েছেন বা ব্যবসা করতেন যে, একেবারেই এই সময়টায় বন্ধ ছিল, তাদের সমস্যা এবং যারা স্থানান্তরিত হচ্ছেন তাদের সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাক্সেস করার সমস্যা।”

মহামারীর মধ্যে বিপাকে পড়ে যারা এক এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় গেছেন সেসব শিক্ষার্থীরা নিকটবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপাতত যুক্ত থাকতে পারবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়ার পর গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা ছাড়া অন্যসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা আছে।

পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি না হওয়ায় এবার পঞ্চম ও অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা যে হবে না, সে কথা সরকার আগেই জানিয়েছিল। আর এইচএসসি পরীক্ষা না নিয়ে অষ্টমের সমাপনী এবং এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল ঘোষণা হবে বলেও ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে।
তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি এবং এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়ে সেজন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী।

“শিক্ষার্থীদের আমি বলব, যাদের সামনের বছর এসএসসি ও এইচএসসি আছে, তারা অবশ্য অবশ্যই নিজেরা নিজেদেরৃ সবার কাছে বই আছে, যতদূর সম্ভব অনলাইনে অ্যাকসেস করবেন। সমস্ত ক্লাসগুলো আছে আপনারা আপনাদের পড়াশোনাগুলো চালিয়ে যান।

“কারণ পরীক্ষা যদি কিছুদিন পরেও হয়, সময়মত হয়ত করার আমরা চেষ্টা করব, সময়মত হলে তো হলই, না হলে যদি কিছুদিন পরেও হয় তাহলেও কিন্তু পরীক্ষা হবে। সেক্ষেত্রে আপনাদের প্রস্তুতিটি ভালোভাবে নিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।”

 

শেয়ার