যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে নৌকা জয়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে নৌকা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। বেসরকারি ফলাফলে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নুরজাহান ইসলাম নীরা পেয়েছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ১৯ ভোট। একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নূর উন নবী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১২ হাজার ৩৯৪ ভোট। ২লাখ ৬৩ হাজার ৬২৫ ভোট বেশি পেয়ে নৌকা বিজয়ী হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ভোট গণনা শেষে যশোর সদর উপজেলা পরিষদে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ।

এর আগে, দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। সকালে ভোটারের উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু বেলা বৃদ্ধির সাথে সাথে উপস্থিতি কিছুটা বাড়ে। কেন্দ্রে নৌকার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে।

দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ চলাকালে সদর উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভোটারদের লম্বা লাইন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান পানি ব্যবস্থা ছিলো প্রতিটি কেন্দ্রে। ভোটারদের মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করার পরেই সেই ভোটারের ভোট গ্রহণ করেছে নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। যারা মাস্ক আনতে পারেনি নির্বাচন অফিস থেকে মাস্ক দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯ টায় সরকারি এম এম কলেজ কেন্দ্রে যেয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি বুথের আগে স্বাস্থ্য সামগ্রী ছিলো। সেখানে তরুণ ভোটারদের লম্বা লাইন লক্ষ্য করা গেছে। এই কেন্দ্রে আসা মসজিদ গেট এলাকার ভোটার নমিতা রাণী বলেন, সকাল বেলায় ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকে তাই ভোট শুরুর প্রথম দিকে ভোট দিতে এসেছি। জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। ঝামেলা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ভোট দিয়ে আসলাম।

দুপুর দেড়টার দিকে যশোর শহরের সেবাসংঘ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন যশোর-৬ (কেশবপুর) সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার। ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে তিনি সন্তুষ্ট হন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং জনগণের উদ্দেশ্যে রাজনীতি করে। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ভোট হচ্ছে। ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সরকার যে উন্নয়ন করেছে তার ফিডব্যাক হিসাবে আবারো আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জনগণ ভোট দিচ্ছে। জনগণ যে রায় দিবে সেটাই আওয়ামী লীগ গ্রহণ করবে। এর আগে বেলা সাড়ে ১১ টায় এই কেন্দ্রে ভোট দেন যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নুরজাহান ইসলাম নীরা। এসময় নীরা সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগের সরকার দেশের বিভিন্ন জায়গার মতো সদর উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন করেছে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য আমার বিশ্বাস জনগণ নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়ী করবে। আমি জয়ী হলে সদর উপজেলাকে স্মার্ট মডেল উপজেলা তৈরিতে কাজ করে যাবো। সেবাসংঘ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে নারী ও পুুরুষ ভোটার ৬ হাজার ২শ’। সকাল ৯ টা থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট গ্রহণ করে নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার নাজমুল হাসান বলেন, সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। সকাল ৯ টা থেকে দুপুর পর্যন্ত শতকরা ৪০ ভাগ ভোট কাস্ট হয়েছিলো বলে জানান তিনি।

সকাল ১০ টায় ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ কেন্দ্রে প্রথমে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে এ কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এ কেন্দ্রে শতকরা ২০ ভাগ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান এ কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার নুরুল ইসলাম। এদিকে অন্যান্য কেন্দ্রের চেয়ে যশোর শহরের শতদল পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র ছিলো ভিন্ন। দুপুরের আগেই এই কেন্দ্রে শতকরা ৫৯ ভাগ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আনারুল আজীম। এই কেন্দ্রে নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য সালাম মোর্শেদী জানান, সকাল থেকে এই কেন্দ্রে ভোটাদের উপস্থিতি ছিলো বেশ। দ্রুত ভোট দিয়ে যার যার বাড়ি চলে গেছে। তাই ভোটাদের ভোটার মাঠে উপস্থিত কম রয়েছে। যারা আছে দুই প্রার্থীই কর্মীর সমার্থক। সদর উপজেলার মন্ডলগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী-পুরুষের ছিলো দীর্ঘ লাইন। স্বাস্থ্যবিধি মানতে আনছার সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে। একজন করে ভিতরে ঢুকিয়ে ভোটারদের ভোট গ্রহণ করছেন নির্বাচনে পুলিং অফিসাররা। এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা পুরুষ ভোটার আক্তার হোসেন জানান, মাঠে কাজ ছিলো। তাই কাজ শেষ করে ভোট দিতে আসলাম। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে চলে যাচ্ছি। এছাড়া মুক্তেশ্বরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আদর্শ সুজলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো স্বাভাবিক।

দুপুর আড়াইটার সময় শহরের মাহমুদুর রহমান বহুমূখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশাব্যঞ্জক ভোটারের উপস্থিতি ছিলো। এই কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার আলফাজ হোসেন জানান, তার এই কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৮৮ জন ভোটার। দুপুর ২ টা পর্যন্ত তার এই কেন্দ্রে শতকরা ৪০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান। তিনি আরো বলেন, দুপুর ১২ টার দিকে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও বা কেউ হুমকি না দিলেও বিএনপির এজেন্টরা ভোট কেন্দ্র থেকে চলে যায়।
বিকাল সাড়ে ৩ টায় যশোর উপশহর বালিকা বিদ্যালয়ে দেখা যায় ভোটারের উপস্থিতি কম। জানতে চাইলে এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জিয়াউর রহমান জানান, এই কেন্দ্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো ভালো। তার এই কেন্দ্রে ৭টি বুথ ও ২ হাজার ৭৫০ জন ভোটার রয়েছে। বিকাল ৩ টা পর্যন্ত তার এই কেন্দ্রে শতকরা ৪৫ ভাগ ভোট কাস্ট হয়েছে। সকাল থেকে কোন বিএনপির এজেন্ট ছিলো না বলে জানান তিনি।

এই কেন্দ্রের পোলিং অফিসার সেলিনা রহমান জানান, আমরা ভোট কেন্দ্রের বুথে আসার আগে প্রত্যেক ভোটারকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে বলছি। তার পরে নির্বাচন অফিস থেকে দেওয়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করেই ভোট গ্রহণের কার্যাবলি শুরু করি। যশোর সরকারি টিচার ট্রেনিং সেন্টারে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে লক্ষ করা গেছে। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আশফাকুর রহমান জানান, এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ৩ হাজার ৩৩৪ জন। বিকাল সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রের ৯শ’ ভোট পড়েছে বলে জানান তিনি। সুষ্ঠু সুন্দর ভোট হওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর ছিলো। এই কেন্দ্রটি সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের ভোট গ্রহণের কেন্দ্র হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর ছিলো বিশেষভাবে। এদিকে এই কেন্দ্রের ধানের শীষের কর্মী সমর্থক ও নৌকা প্রতীকের কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের ভোটার সিলিপ নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। এই কেন্দ্রের সামনে দুই প্রার্থীদের পোস্টারে- পোস্টারে সমস্ত কেন্দ্র প্রাঙ্গনে নির্বাচনী আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। বিকাল ৪ টায় শহরের এম এন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে যেয়ে দেখা যায়, ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো স্বাভাবিক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে একজন করে কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বের হচ্ছেন। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জাহিদ হাসান জানান, তার কেন্দ্রের ৩ হাজার ৩১২ ভোটের মধ্যে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত শতকরা ৩০ ভাগ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ভোটগ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ করতে সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ১৭৫টি কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। ১৭৫ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও ১ হাজার ১৩ জন পোলিং অফিসার নিয়োজিত ছিলো। নির্বাচনী এলাকায় দুইজন জুডিসিয়াল ও ১৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৫শ’ পুলিশ সদস্য, ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ছিলো। ১৮টি মোবাইল টিম ও ৬টি স্ট্রাইকিং ফোর্সের ৬টি টিম নির্বাচনের মাঠে সার্বক্ষণিক কাজ করেছে।

যশোরের এই ভোটে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক ছিলো।

জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তেমন কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি কোনও প্রার্থীর লোকজন ভোট চলাকালে বা পরে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে, নির্বাচনে দেড় শতাধিক কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ করছে বিএনপি। যশোর জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপনির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার বরাবর এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ দিয়েছেন ধানের শীষ প্রার্থীর প্রধান এজেন্ট ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকন।

উল্লেখ্য, যশোর সদর উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার পদত্যাগ করে কেশবপুর সংসদীয় উপ-নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। যার কারণে চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয়।

শেয়ার