বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়

ভিডিও অপসারণের নির্দেশ হাইকোর্টের, প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ভিডিওটি অপসারণ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। পাশাপাশি বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে ভিডিওটি পেনড্রাইভ বা সিডিতে সংরণ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত নারী ও তার পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
একইসঙ্গে ওই নারীর নিরাপত্তা, জবানবন্দি নেওয়া, দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ সার্বিক ঘটনায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো অবহেলা আছে কি না তা অনুসন্ধানে নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়েছে হাই কোর্ট।
কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে হাই কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলার সমাজ সেবা কর্মকর্তা ও চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজের অধ্যকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।
এছাড়া আদালত এ ঘটনায় করা ফৌজদারি মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছে। ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন রাখা হয়েছে।
দেশজুড়ে ােভ তৈরি করা নির্যাতনের এ ঘটনা সোমবার নজরে আনার পর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. মহি উদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ এ আদেশ দেয়।
দুর্বৃত্তদের হাত থেকে ওই নারীকে রায় এবং দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদপে নিতে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ থানার অন্যান্য কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বিআরটিসির চেয়ারম্যান, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, বেগমগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক একজন নারীকে বিবস্ত্র করে মারধর করছে। তাদের একজন পা দিয়ে ওই নারীর মুখ চেপে ধরেছে। বার বার আকুতি জানানোর পরও নির্যাতন করা বন্ধ করেনি তারা।
এক মাসেরও বেশি সময়ের আগের এই ঘটনার ভিডিও রোববার ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ােভ দেখা দেয়। নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি আসে বিভিন্ন মহল থেকে। এরপর ওই নারীকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় স্থানীয় পুলিশ। পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে ওই নারী বেগমগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার বরাত দিয়ে সেখানকার ওসি হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন, দাম্পত্য কলহের জেরে ওই নারী একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তার বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। দীর্ঘ দিন পর গত ২ সেপ্টেম্বর তার সঙ্গে দেখা করতে সেখানে যান তার স্বামী।
“সেদিন রাত ৯টার দিকে আসামিরা তাদের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং ওই নারীর স্বামীকে মারধর করে পাশের আরেকটি ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখে। পরে তারা ওই নারীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তাতে বাধা দিলে আসামিরা তাকে নির্যাতন করে এবং মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ভিডিও করতে থাকে। ওই নারীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা কাউকে কিছু জানালে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যায়।”
এরপর ওই নারী কাউকে কিছু না জানিয়ে জেলা শহরের মাইজদীতে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেও আসামিরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ‘কুপ্রস্তাব’ দেয়। রাজি না হলে সেই রাতের ভিডিও তারা ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় বলে মামলায় বলা হয়।
ওই নারী তাদের কথায় রাজি না হওয়ায় আসামিরা রোববার দুপুরে সেই ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে দিলে তা ভাইরাল হয়ে যায়।
এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা আছে কি না এবং ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে অপসারণে বিটিআরসিকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সোমবার সকালে আদালতের কাছে আরজি জানান আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।
আদালত তাকে লিখিত আবেদন নিয়ে আসতে বলে বেলা আড়াইটায় শুনানির জন্য রাখে। দুপুরে শুনানি নিয়ে আদালত এই আদেশ দেয়।
নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠন করে দেওয়া তদন্ত কমিটিকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বলা হয়েছে বলে জানান আবেদনকারী আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন, সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ইয়াদিয়া জামান, তানজীম আল ইসলাম, জামিউল হক ফয়সাল ও রাশিদা চৌধুরী নিলু শুনানিতে অংশ নিয়ে এ বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

শেয়ার