দেরবরেণ্য ধান বিজ্ঞানী মণিরামপুরের বধূ ‘ধান কণ্যা’ তমাল লতার মৃত্যু, শোক

নেংগুড়াহাট মনিরামপুর॥ যশোর মনিরামপুর উপজেলার নেংগুড়াহাট এলাকায় চালুয়াহাটি ইউনিয়নের ডাঃ তপন সরকারের স্ত্রী ধানকন্যা খ্যাত ধান বিজ্ঞানী ড. তমাল লতা আদিত্য হৃদরোগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পরলোক গমন করেন। এদিকে তার অকাল মৃত্যু তে চালুয়াহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বার, ইউনিয়নের কৃষি কর্মকর্তা, নেংগুড়াহাট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকগণ, ফাজিল মাদ্রাসা প্রধানসহ বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য ড. তমাল লতা আদিত্যকে তার গ্রামের বাড়ি নেংগুড়াহাট রতœশাহাপুর গ্রামের তার নিজ এলাকায় মোবারকপুর মহাশ্মশানে শেষ কৃত্য করা হয়। জানাগেছে আমৃত্যু ধান গবেষণায় তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। উদ্ভাবন করেছেন ধানের ১৫টি জাত। এছাড়া পরোক্ষভাবে আরো বেশ কিছু জাত উদ্ভাবন প্রক্রিয়াতে নিয়োজিত ছিলেন। ধান গবেষণায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ড.তমাল লতা আদিত্য বিভিন্ন পুরস্কারেও ভূষিত হন। তার উদ্ভাবনী ও ধান উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ধান কন্যা’ হিসেবে বেশ সমাদৃত ছিলেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পরিচালক গবেষণা হিসেবে নিযুক্ত এ ধান কন্যা বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে বারোটায় মারা যান। ৫২ বছর বয়সী এ বিজ্ঞানী হৃদরোগে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুতে ব্রি পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত আত্মার চিরশান্তি কামনা করেছেন ব্রি মহাপরিচালক ড. মোঃ শাহজাহান কবীর। এক শোক বার্তায় তিনি শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ধান গবেষণার মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে তার অসামান্য অবদান জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে। বিজ্ঞানী তমাল লতা ১৯৯৪ সালে ব্রি- তে যোগদান করেন। তার উদ্ভাবনী ও ধান উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ‘ধান কন্যা’ হিসেবে বেশ সমাদৃত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র, চিকিৎসক স্বামীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ড. তমাল লতা আদিত্য ৩১অক্টোবর ১৯৬৭ সালে ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার কুন্ডল বালিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত্যুঞ্জয় আদিত্য এবং মাতার নাম সুনীতি রাণী আদিত্য। তিনি ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং ২০০২ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ প্রজনন এবং বায়োটেকনোলজি বিষয়ে পি,এইচ,ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২১ নভেম্বর ১৯৯৪ সালে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ৯ আগস্ট ২০১০ সালে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে পদন্নোতি লাভ করেন। এছাড়া ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর তিনি পরিচালক গবেষণা চলতি দায়িত্ব পদে যোগদান করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পদে কর্মরত ছিলেন। ধানকন্যা বিজ্ঞানী ড. তমাল লতা আদিত্য। ধান প্রজননবিদ হিসেবে অনেকগুলো ধানের জাত উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে ব্রি ধান ৫৭, ব্রি ধান ৫৮, ব্রি ধান ৬৩, ব্রি ধান ৭০, ব্রি ধান ৮০, ব্রি ধান ৮১, ব্রি ধান ৮২, ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ৯০ এবং ব্রি ৯৫ ধানের জাতগুলো উদ্ভাবনে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। এছাড়াও ব্রি ধান ৪৬, ব্রি ধান ৪৯, ব্রি ধান ৫০, ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৭১ ধানের জাতসমূহ উদ্ভাবনে তার অবদান ছিল। ধানকন্যা গবেষণায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ড. তমাল লতা আদিত্য বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। তার নেতৃত্বে ব্রি- র উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার অর্জন করে। ড. আদিত্য আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জয়া আলোকিত নারী ২০২০ সম্মাননায় ভূষিত হন। ড.তমাল লতা আদিত্য ব্রির গবেষণা কর্মসূচি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দেশ- বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে তার ৩০টির বেশি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ধানকন্যা বিজ্ঞানী ড.তমাল লতা আদিত্য পেশাগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, প্লান্ট ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ব্রি সাইন্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সসহ নানাবিধ পেশাজীবী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন।

শেয়ার