কামিনী রায়: এক সময়ের ‘জনৈক বঙ্গমহিলা’

22

সাহিত্যকথা প্রতিবেদক॥ ‘ত্রিদিবে দেবতা নাও যদি থাকে ধরায় দেবতা চাহি গো চাহি,/মানব সবাই নয় গো মানব, কেহ বা দৈত্য, কেহ বা দানব,/উৎপীড়ন করে দুর্বল নরে, তাদের তরে যে ভরসা নাহিÑ/ধরায় দেবের প্রতিষ্ঠা চাহি।’
এই কঠিন কিন্তু মর্মভেদী কথাগুলোর স্রষ্টা বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা বাঙালি কবি, নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায়। এমাসেই তার জন্মদিন। জন্মেছিলেন ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর, বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের বাসন্ডা গ্রামে। তিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্যক্তিত্ব। পিতার দেওয়া নাম কামিনী সেন। বিয়ের পর স্বামী কেদার নাথ রায়ের পদবি যুক্ত হয়ে হন কামিনী রায়। তিনি একসময় ‘জনৈক বঙ্গমহিলা’ ছদ্মনামে লিখতেন।
১৮৮৬ কলকাতা বেথুণ কলেজ থেকে কামিনী রায় সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বেথুন কলেজেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। সেসময় হিন্দু নারীদের লেখাপড়া করা ছিল নিন্দণীয় ও গর্হিত ব্যাপার ।
কবি কামিনী রায় ৮ বছর বয়স থেকে কবিতা লিখতেন। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘আলো ও ছায়া’; যার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নির্মাল্য (১৮৯১), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), দ্বীপ ও ধূপ (১৯২৯)। শিশুদের জন্য লিখিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে, পৌরাণিকী (১৮৯৭), গুঞ্জন(১৯০৫), বালিকা শিক্ষার আর্দশ (১৯১৮)। ঠাকুরমার চিঠি (১৯২৪) প্রভৃতি।
অম্বা (১৯১৫) তাঁর লেখা জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে অন্যতম। এবং চন্দ্রাতীরের জাগরণ নাট্যকাব্যটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এছাড়াও তাঁর রয়েছে বেশকিছু অনুবাদ গ্রন্থ উল্লেখ্য ধর্ম্মপুত্র (১৯০৭)।
১৮৯৪ সালে কেদারনাথ রায়ের সাথে কামিণী রায়ের বিয়ে হয়। তাঁদের পরিবারের জন্ম হয় ৩ সন্তানের। ১৯০০ সালে তাদের প্রথম সন্তানটি মারা যায়। ১৯০৩ সালে কামিনী রায়ের বোন প্রম কুসুম মারা যায়। ১৯০৬ সালে তার ভাই ও বাবা মারা যান। এরপর তার সন্তান লীলা ও অশোকের মৃত্যু হলে সবাইকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সব হারানোর ব্যথা তার রচনায় এক অনন্য মাত্র পায়। সেসময়ে মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থাও এক বিরল ঘটনা ছিল, এবং কামিনী রায় হয়ে উঠেছিলেন নারীবাদে বিশ্বাসী। লিখেছেন সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ও নারী জাগরনের পক্ষে। তিনি ১৯২২-২৩ সালে নারী শ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন।
কবি কামিনী রায়ের স্মরণে ১৯২৭ সাল থেকে ‘জগত্তারিনী পুরস্কার’ প্রবর্তন করেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
শেষ জীবনে তিনি ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের হাজারীবাগ বসবাস করতেন এবং ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেখাইে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তার একটি লেখা আজও আমাদের পথ চলার পাথেয়Ñ
‘সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’