যশোরে চাঞ্চল্যকর ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই ৫ জন গ্রেফতার, আড়াই লাখ টাকা উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে কোতোয়ালি থানার কাছে বোমা ফাটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে ব্যবসায়ীর টাকা ছিনতাই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী টিপুসহ ৫ জনকে বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করেছে পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাই করা ২ লাখ সাড়ে ৪৮ হাজার টাকা, ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ২টি চাকু, টাকার ব্যাগ ও একটি মোটর সাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তিনি আরো জানিয়েছেন, এই ঘটনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী জামাই রাজ্জাকসহ আরো তিনজনকে আটকের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। এই অপরাধীদের ছায়াদানকারী গডফাদারদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নিচ্ছে পুলিশ।
এদিকে, গতকালই আটককৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। এর মধ্যে টিপু ও শুভ নামে দুইজন ঘটনার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। অন্য তিনজনকে সাতদিনের রিমান্ডের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুদ্দীন হোসাইন জবানবন্দি শেষে তাদেরকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন। আটককৃতরা হলো, যশোর শহরের পুলিশ লাইন টালিখোলা এলাকার শফি দারোগার বাড়ির ভাড়াটিয়া বারান্দীপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডিম রিপনের সহযোগী মুনসুর মোল্যার ছেলে টিপু (২৪), শহরের বারান্দী মোল্যাপাড়ার রবিউল ইসলামের ছেলে সাঈদ ইসলাম ওরফে শুভ (২৪), ধর্মতলা হ্যাচারিপাড়ার রুহুল আমিনের ছেলে বিল্লাল হোসেন ওরফে ভাগনে বিল্লাল (২২), সিটি কলেজ ব্যাটারিপট্টির নিজাম উদ্দিনের ছেলে রায়হান (২৮) এবং পূর্ব বারান্দী মালোপাড়ার মুফতি আলী হুসাইনের ছেলে ইমদাদুল হক (২১)।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে থানার পাশেই ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) এর সামনে বোমা ফাটিয়ে ব্যবসায়ীর সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় ছুরিকাঘাত ও বোমার আঘাতে টাকা বহনকারী দু’জন আহত হন। প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেছেন, ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঘটনার পর থেকে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা ধর্মতলা, বসুন্দিয়া, আলাদিপুর, বারান্দী মোল্যাপাড়া, সিটি কলেজ ব্যাটারিপট্টি ও পুুলিশ লাইন টালিখোলাসহ বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে ওই ৫জনকে আটক করেছে। পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ২ লাখ সাড়ে ৪৮ হাজার টাকা, ২টি চাকু, টাকার ব্যাগ এবং ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত আটক রায়হানের (যশোর-ল-১৩-২৬৩৩) মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। প্রেসব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সালাউদ্দীন সিকাদার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক-সার্কেল গোলাম রব্বানী, কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান, ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোমেন দাস, চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর রোকিবুজ্জামান, সদর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর তুষার কুমার মন্ডল প্রমুখ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শহরের মণিহার এলাকার আরআই এন্টারপ্রাইজ এবং আরএন রোডের আগমনী মোটরর্সের মালিক ইকবাল হোসেনের দুইটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিনই ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকে টাকা জমা করা হয়। ওই টাকা দেখে প্রতিষ্ঠানের লেবার টিপুর লোভ লাগে। সে সুযোগ খোঁজে কখন কিভাবে বড় চালানের কোন টাকা হাতিয়ে নেয়া যায়। ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ব্যাংকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখে টিপুর পরিচিত ফল ব্যবসায়ী জামাই রাজ্জাককে বলে। রাজ্জাক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য লোক এবং বোমা, অস্ত্র-গুলি ও চাকু সংগ্রহ করে। লোকজনসহ ঘটনার দিন দুপুরে এনামুল ও ইমন টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে রওনা দেয়ার পরে টিপু তাদের পিছু নেয়। শহরের এমকে রোডের ইউসিবিএল ব্যাংকের সামনে এসে টিপু টাকা বহনকারী দুইজনকে চিনিয়ে দেয়। তারা প্রথমেই এনামুলের কাছ থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। হাত থেকে ব্যাগ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় এনামুলকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে দেখে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এরই মধ্যে টাকার ব্যাগ নিয়ে চলে যায়। এরপর থেকে কোতোয়ালি থানা, ডিবিসহ বিভিন্ন ক্যাম্প ও ফাঁড়ি পুলিশের সমন্বয়ে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে ওই ৫ জনকে আটক করে। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে ঘটনার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আটক টিপু ও সাঈদ ইসলাম শুভ জবানবন্দি দিয়েছে। ভাগ্নে বিল্লাল, রায়হান ও ইমদাদুল হককে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা সদর ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক তুষার কুমার মন্ডল।
স্থানীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, আটক টিপু বারান্দীপাড়ার অপর চিহ্নিত সন্ত্রাসী বুনো মিন্টুর নিকটাত্মীয়। এই ছিনতাইয়ের ঘটনা বারান্দীপাড়া থেকে পরিকল্পনা করা হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী আনিচুর রহমান ফিঙে লিটনের হুকুমে তার ভাই ডিম রিপন ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক। তারই পরিকল্পনায় এই ছিনতাই ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা মনে করে। সে কারণে ছিনতাই হওয়ার পরই টাকা গুলো ফিঙে লিটনের ভগ্নিপতি মাসুদুর রহমান নান্নুর বাড়িতে বসে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়। এরপর থেকে নান্নু গা-ঢাকা দিয়েছে।

শেয়ার