ভ্যাকসিন যেন সবাই একসঙ্গে পায় : প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে ভাষণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা চাইলেন শেখ হাসিনা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ মহামারীর মহাসঙ্কটে পৃথিবীর সব মানুষের ভাগ্য যে ‘একই সূত্রে গাঁথা’ সেই সত্যটি বিশ্ব নেতাদের মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবন সম্ভব হলে তা সব দেশের মানুষের হাতে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও এ বিশ্বকে নিতে হবে।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের নেতা হিসেবে শনিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় শেখ হাসিনা বলেন, “আশা করা হচ্ছে বিশ্ব শিগগিরই কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন পাবে। এই ভ্যাকসিনকে বৈশ্বিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সকল দেশ যাতে এই ভ্যাকসিন সময় মত এবং একইসঙ্গে পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
কারিগরি জ্ঞান ও মেধাস্বত্ব দেওয়া হলে, এই ভ্যাকসিন ‘বিপুল পরিমাণে উৎপাদনের সক্ষমতা’ বাংলাদেশের রয়েছে বলেও টিকা তৈরির দৌড়ে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলোকে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গত বছরের শেষে চীন থেকে ছড়াতে শুরু করে পুরো বিশ্ব দখল করে নেওয়া নতুন করোনাভাইরাস ইতোমধ্যে সোয়া তিন কোটি মানুষকে আক্রান্ত করেছে, মৃত্যু ঘটিয়েছে প্রায় দশ লাখ মানুষের।
পৃথিবীর মানুষ এখন অপেক্ষা করছে টিকার জন্য, এর ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের অনেক কিছু, আর ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব দেশের জন্যই এটা সত্যি।
নতুন এই করোনাভাইরাসের কার্যকর টিকা তৈরির চেষ্টায় বিশ্বে এখন প্রায় দুইশ গবেষণা চলছে। এর মধ্যে আধা ডজন সম্ভাব্য টিকা পৌঁছেছে পরীক্ষার একেবারে শেষ পর্যায়ে।
ধনী দেশগুলো বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছে, যাতে টিকা তৈরি হলে সবার আগে তা পাওয়া যায়।
তাহলে গরিব দেশগুলো, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ যেসব দেশের বাসিন্দা, তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে? কিছু দেশ টিকা পেলে আর অন্য দেশে মহামারী চলতে থাকলে বিশ্ব কী ভাইরাসমুক্ত হতে পারবে?
সেজন্যই জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন এ বিশ্ব সংস্থার জন্ম ইতিহাস এবং ঐক্যের গুরুত্ব।
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেমন জাতিসংঘ সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের উপর গুরুত্ব আরোপের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি এই মহামারী আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সঠিক নেতৃত্ব প্রদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।”
শেখ হাসিনা বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিদ্যমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জসমূহ আরও প্রকট হয়েছে। এ মহামারী আমাদের উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছে যে, এ সঙ্কট উত্তরণে বহুপাক্ষিকতাবাদের বিকল্প নেই।”
করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে জাতিসংঘের ৭৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন ‘ভার্চুয়ালি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতিসংঘে তার ভাষণটি দিয়েছেন ধারণ করা ভিডিওর মাধ্যমে।
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যূত ১১ লাখেরও বেশি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও এখনও ফেরত নেয়নি।
“এই সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি এবং এর সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ব্যাপারে আরও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।”
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে ছিল।
২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর দমন-পীড়নের মুখে আরও ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
মিয়ানমার তার দেশের এই নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। রাখাইনে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা না পেলে মিয়ানমার ফিরতে চাইছেন না তারা।
রোহিঙ্গাদের ভয় কাটাতে মিয়ানমার সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে আন্তর্জাতিক নান ফোরামে অভিযোগ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গত বছরের ভাষণেও রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমার সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন শেখ হাসিনা।
কোভিড-১৯ মহামারীরা কারণে সরাসরি না গিয়ে ভার্চুয়ালি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া এবারের ভাষণে বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, “সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়- এই নীতিবাক্য আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূলমন্ত্র। এ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং শান্তির সংস্কৃতি বিনির্মাণে নিয়মিত অবদান রেখে চলেছে।”
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “শান্তিরক্ষী প্রেরণে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। সংঘাতপ্রবণ দেশসমূহে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তি বজায় রাখতে আমাদের শান্তিরক্ষীগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম দায়িত্ব।”
শেখ হাসিনা বলেন, “শান্তির প্রতি অবিচল থেকে আমরা সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। মহামারীর ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবেলায় জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য।
পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী বিনির্মাণে বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিন বলেন, “সে বিবেচনা থেকে পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশসমূহের কার্যক্রমকে আমরা জোর সমর্থন জানাই।”
জাতিসংঘের সভাকক্ষটি ঘিরে ‘ব্যক্তিগত আবেগের’ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৭৪ সালে এই কক্ষে দাঁড়িয়ে আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সদ্য স্বাধীন দেশের সরকার প্রধান হিসেবে মাতৃভাষা বাংলায় প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন। আমিও এই কক্ষে এর আগে ১৬ বার সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিশ্বশান্তি ও সৌহার্দ্যের ডাক দিয়েছি। সরকার প্রধান হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে এটি আমার ১৭তম বক্তৃতা।”
কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্ব এখন মানব ইতিহাসের এক ‘অভাবনীয় দুঃসময়’ অতিক্রম করছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি স্বাস্থ্যকর্মীসহ সকল পর্যায়ের জনসেবকদের, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছেন। সাধুবাদ জানাই জাতিসংঘ মহাসচিবকে এই দুর্যোগকালে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগের জন্য। বাংলাদেশ শুরু থেকেই যুদ্ধ বিরতিসহ তার অন্যান্য উদ্যোগসমূহকে সমর্থন জানিয়ে আসছে।”
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। তার ৮ দিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব সভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। এ বছর তার ৪৬ বছর পূর্ণ হল।
তার মেয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। তারই দেখানো পথে হেঁটে আমরা আজ বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল আসনে নিয়ে আসতে পেরেছি।
“এই মহান পরিষদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতিসংঘ সনদে যে মহান আদর্শের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের জনগণের আদর্শ এবং এই আদর্শের জন্য তারা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সেই দৃপ্ত ঘোষণা ছিল মূলত ‘বহুপাক্ষিকতাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ’। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে তার দেওয়া সেই দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলার জন্য আজও ‘সমানভাবে প্রাসঙ্গিক’।
“বাঙালি জাতির জন্য এ বছরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ বছর আমরা আমাদের জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। বঙ্গবন্ধুর জীবন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং সাফল্য আমাদের কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেমন সাহস যোগায়, তেমনি সঙ্কটের উত্তরণ ঘটিয়ে নুতন দিনের আশার সঞ্চার করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে সকল বঞ্চিত ও উন্নয়নকামী দেশ ও মানুষের পক্ষ হতে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।”
শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতার আজীবন সংগ্রামের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনার কথাও ভাষণে বলেন শেখ হাসিনা।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সেই হত্যাকা-ে বাবা-মা, ভাই-ভাবিসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হারান শেখ হাসিনা। সে সময় বিদেশে থাকায় তিনি নিজে এবং ছোট বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। এরপর ৬ বছর তাদের শরণার্থী হয়ে কাটাতে হয় বিদেশে।
সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, “আমি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে এ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করছি এ জন্য যে, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম জঘন্য, নির্মম ও বেআইনি হত্যাকা- যেন আর না ঘটে।”
মহামারীতে বাংলাদেশ : করোনাভাইরাসের অভিঘাতে বাংলাদেশকে যে সঙ্কটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে এবং সেখান থেকে উত্তরণে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তা সবিস্তারে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, তার সরকার প্রথম থেকে জীবন ও জীবিকা দুই ক্ষেত্রেই ‘সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে’ কার্যক্রম শুরু করেছিল। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন যাতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেজন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজে মোট ১৩.২৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৪.০৩ শতাংশের সমান। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে ব্যাপকভাবে।
তিনি বলেন, “সরকারি সহায়তার পাশাপাশি আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে তহবিল সংগ্রহ করে এতিম ও গরীব শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, স্কুল শিক্ষক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ যারা সাধারণভাবে সরকারি সহায়তার আওতাভুক্ত নন, তাদের মধ্যে ২.৫ বিলিয়নের বেশি টাকা বিতরণ করি। যার ফলে সাধারণ মানুষকে করোনাভাইরাস খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি।”
করোনাভাইরাস যাতে ব্যাপকহারে ছড়াতে না পারে, সেজন্য সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর পাশাপাশি সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যার সুফল হিসেবে আমরা লক্ষ্য করছি, ঋতু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে যেসব রোগের প্রাদুর্ভাব হয়, এবার সেসব রোগ তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না।”
শেখ হাসিনা বলেন, এই মহামারীর সঙ্কটে তার সরকার খাদ্য উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের শিল্প কারখানা সচল রাখা এবং কৃষি ও শিল্পপণ্য যথাযথভাবে বাজারজাতকরণের বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। তার ফলে বাংলাদেশের স্ব্যাস্থ্য ও অর্থনীতি ‘এখনও তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো’ আছে।
কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী উৎপাদনে স্থবিরতার পরও বাংলাদেশর ৫.২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
মহামারীর মধ্যে বিদেশে বাংলাদেশের অনেক কর্মীর কাজ হারানোর বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, “অনেককে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা দেশে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের প্রণোদনা বাবদ ৩৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছি। তবে কোভিড-পরবর্তী সময়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয়টি সহমর্মিতার সঙ্গে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অভিবাসী গ্রহণকারী দেশসমূহের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর বিদ্যমান সমস্যাগুলো যে প্রতিনিয়ত ‘প্রকট হচ্ছে’ এবং মহামারীর এই সঙ্কটকালেও বাংলাদেশবে যে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হয়েছে, সে কথাও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’, এই নীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মূলমন্ত্র। এ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং শান্তির সংস্কৃতি বিনির্মাণে নিয়মিত অবদান রেখে চলেছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে শান্তিরক্ষীর সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে।
“সংঘাতপ্রবণ দেশসমূহে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তি বজায় রাখতে আমাদের শান্তিরক্ষীগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম দায়িত্ব।”
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে অবর্ণনীয় দুর্দশা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মত জঘন্য অপরাধের শিকার হয়েছে বাঙালি জাতি। সেই কষ্টকর অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশ নিপীড়িত ফিলিস্তিনী জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি সমর্থন দিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ১১ লাখের বেশি ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যূত মিয়ানমার নাগরিককে’ যে আশ্রয় দিয়েছে এবং তিন বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত মিয়ানমার যে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি, সে বিষয়ে আবারও বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
“এই সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি এবং এর সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ব্যাপারে আরও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।”
তিনি বলেন, জাতিসংঘ সনদে অন্তর্নিহিত বহুপাক্ষিকতাবাদের প্রতি বাংলাদেশের ‘অগাধ আস্থা’ রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও বহুপাক্ষিকতাবাদের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তার সরকার ‘বদ্ধপরিকর’।
“পাশাপাশি আমরা আমাদের জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত সে সোনার বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত- যেখানে সবার মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে জাতি ও বিশ্বের নিকট এটিই আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।”

শেয়ার