কালজয়ী কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ অবলম্বনে গীতি নৃত্যনাট্য
যশোর রোডে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র ঘটনাপ্রবাহ’র মঞ্চায়ন দেখে বাক্রুদ্ধ নতুন প্রজন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন যশোর রোডের শরণার্থীদের যুদ্ধবিভীষিকা, অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র নিয়ে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ রচনা করেছিলেন কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। এটি শুধু একটি কবিতাই নয়, বাঙালির আত্মত্যাগের একটি মহামূল্যবান ইতিহাস। তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা অবলম্বনে গীতিনৃত্যনাট্য পরিবেশন করেছেন যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭ টা ১০ মিনিটে যশোর জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমিতে গীতিনৃত্যনাট্যটি মঞ্চায়ন হয়।
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা অবলম্বনে গীতিনৃত্যনাট্যটি মঞ্চায়নের সময়ে পুরো শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চটি যেন ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত জমিনে পরিণত হয়’। শরণার্থীদের বিভীষিকা ও যুদ্ধচিত্রে জীবন্ত হয়ে ওঠে মার্কিন প্রতিবাদী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি।
বাঙালিদের ওপর ব্রিটিশদের নির্যাতন চিত্র দিয়ে গীতিনৃত্যনাট্যটি শুরু হয়। এরপর দেশ ভাগ, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর রোডে শরণার্থীদের যুদ্ধ-বিভীষিকা ও রক্তাক্ত জীবনচিত্রের ঘটনাপ্রবাহ মঞ্চায়ন হয়। যশোর রোডে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের যে ঢল নামে তারই প্রতীকী উপস্থাপনায় শিহরিত হন হলভর্তি দর্শক। গভীর মনোযোগে যশোর রোড দিয়ে কলকাতা যাওয়ার দৃশ্য দেখেন দর্শকরা। জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শতাধিক শিল্পীর প্রাণবন্ত এবং মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় গীতিনৃত্যনাট্যটি দেখে জলে ভিজে ওঠে দর্শকদের ব্যথাতুর চোখগুলো।
গীতিনৃত্যনাট্যতে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দানব পাকআর্মি নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগে মেতে ওঠে। এমনই একসময় সেপ্টেম্বর মাস। বৃষ্টি আর কাদাপানি উপেক্ষা করে সেদিন লাখ লাখ মানুষ ঐতিহ্যবাহী যশোর রোড তৎকালীন পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসড়ক ধরে প্রাণ রক্ষায় মাইলের পর মাইল হেঁটে দিনের পর দিন সময় নিয়ে রওনা হন ওপার বাংলা অর্থাৎ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সড়কটির ব্যবহার কিছুটা হ্রাস পেলেও দু’দেশের লোক ও পণ্য চলাচলে তখনও সড়কটি ছিল প্রধান সড়ক। ৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর এটি কার্যত ‘কানাগলিতে’ পরিণত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সড়কটি পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পথ ধরেই অজানার উদ্দেশে ঘর ছেড়েছিলেন লাখ লাখ নিরন্ন মানুষ। পেছনে যুদ্ধ ও মৃত্যু এবং সম্মুখে অসীম অনিশ্চয়তার মাঝে নিজ দেশ ছেড়ে এসব মানুষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তারা পিছনে ফেলে গিয়েছিলেন প্রিয়জনের লাশ। তাদের অনেকেই আর দেশে ফেরেননি। পথেই সর্বস্ব খুইয়ে তারা হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের অতলে। লাখো লাখো দুর্দশাপীড়িত মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে মার্কিন প্রতিবাদী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামে এক অনন্য কবিতা। ‘লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে/লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়/ গৃহহীন ভাসে শত শত লোক/লক্ষ জননী পাগল প্রায়/রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু/পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে/এইটুকু শিশু, এতবড় চোখ/দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে/সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর/ঘর ভেঙ্গে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে, যশোর রোডের দু’ধারে মানুষ এত এত লোক শুধু কেন মরে/ ………………… ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে/ যুদ্ধে ছিন্ন ঘরবাড়ি দেশ/ মাথার ওপরে বোমারু বিমান/ এই কালোরাত শেষ হবে কবে?
অনুষ্ঠান শেষে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় জেলা প্রশাসক ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি তমিজুল ইসলাম খান বলেন, মুজিববর্ষে শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজন নতুন প্রজন্মকে কিছুটা হলেও জাগ্রত করে তোলে। অনেকের মতো আমার চোখটাও ছলছল করে উঠেছে। তিনি এই আয়োজনের জন্যে শিল্পী কলাকুশলী সকলকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষী এই কবিতা অবলম্বনে মুজিববর্ষ উপলক্ষে যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে পরিবেশিত হয়েছে গীতিনৃত্যনাট্য ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গীতিনৃত্যনাট্য সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসভাপতি সংস্কৃতিজন সুকুমার দাস। নাট্যাংশ পরিচালনা করেন কামরুল হাসান রিপন, নৃত্য সঞ্জীব চক্রবর্তী ও খাদিজা ইসলাম তন্বি, সংগীতে তাওহিদুল ইসলাম ও শায়ন্ততী দেবনাথ। সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড অংশ পরিচালনা করেছেন কামরুজ্জামান তাপু এবং ভিডিও সম্পাদনায় অসিম সাহা। জনসমাগম এড়াতে আয়োজনটি জেলা প্রশাসন, যশোরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এবং সিটি কেবল নেটওয়ার্কে সরাসরি সম্প্রচার করে।

শেয়ার