সুন্দরবনে পর্যটক নিষিদ্ধের সুযোগে বেপরোয়া দুর্বৃত্ত চক্র

*উজাড় হচ্ছে ‘কর্তননিষিদ্ধ’ গাছ
*বিষ দিয়ে মারা হচ্ছে হাজার হাজার টন মাছ

এসএম সাঈদুর রহমান সোহেল, খুলনা ॥ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সুন্দরবনে সব ধরণের পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সরকার গত ১৯ মার্চ থেকে সুন্দরবনে পর্যটকদের সমাবেশকে নিষিদ্ধ করে।
এদিকে, বিশ্বঐতিহ্য এ বনে ভ্রমণ বন্ধ থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা অবাধে হরিণসহ বন?্যপশু হত?্যা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া উজাড় হচ্ছে ‘কর্তননিষিদ্ধ’ মূল্যবান গাছ এবং বিষ দিয়ে মারা হচ্ছে হাজার হাজার টন মাছ। এরফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বসেছে।
পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দেয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) খুলনা বন ভবনের সামনে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোশিয়েশন অব সুন্দরবন (টিওএএস) মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। তারা বলেন, সুন্দরবন খুলে দিলে অপরাধীদের তৎপরতা কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের নীল কমল, পাথকষ্টা, গেওয়াখালির অংশ বিশেষ, নোটাবেকি, মান্দার বাড়ি, পুস্পকাটিসহ বনের অন্য সকল অভয়ারণ্য এলাকায় অসাধু জেলেরা মাছ শিকার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সূত্র জানান, নীলকমল অভয়ারণ্যের শিসখালী ও বালি নদীর আশপাশের এলাকা, চান্দাবুনি ও বুন্দো নদীসহ আশপাশের খালে মৎস্য বাবসায়ি, জহির মেম্বর, আব্দুল মাজেল, মফিজুল, এছাক ও মালেকের জেলেরা বছরের প্রায় মাছ মাছ শিকার করে থাকে। এছাড়া নোটাবেকি, পুস্পকাটি অভয়ারণ্যের নান্দী ও জলঘাটাবন এলাকার নদী-খালে মৎস্য ব্যবসায়ি ও রজব আলী, কামরুল গাজী, মহিদুলসহ কয়রা ও শ্যমনগরের শতাধিক জেলে মাছ শিকার করছেন।
জেলেরা জানায়, গহীন সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকা থেকে মাছ ধরে নৌাকা যোগে লোকালয়ে পৌঁছাতে পথে ঘাটে সবখানে ম্যানেজ করে চলতে হয়। বড় অফিসারদের স্পিড বোটের সামনে পড়লে আর রেহাই পাওয়া যায় না। এছাড়া অভয়ারণ্যে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেয়ায় অভয়ারণ্য এলাকার বনরক্ষীরা জেলে নৌকাপ্রতি ১ হাজার টাকা করে নেয়।
এর বাইরেও ‘কর্তননিষিদ্ধ’ গাছ কেটে পাচার এবং হরিণসহ বন্যপ্রাণি হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
জানতে চাইলে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ আবু সালেহ বলেন, অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ। বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিম নিয়মিত টহল করছে। অভয়ারণ্যেরনদী-খালে মাছ শিকার করা অসাধু জেলেদের পাকড়াও করতে অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ‘ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোশিয়েশন অব সুন্দরবন’ (টিওএএস)-এর যুগ্ম-সম্পাদক মাযহারুল কচি বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দেওয়ার দাবিতে বন সংরক্ষকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এরআগে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দিতে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন স্বাস্থ্যবিধি সম্পূর্ণভাবে অনুসরণসহ কয়েকটি শর্ত দিয়ে ট্যুরের অনুমোদন দেয়। কিন্তু বন বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশে তারা এ মুহূর্তে কোনো ট্যুরের অনুমোদন দিতে পারছেন না। ’
মাযহারুল কচি আরও বলেন, ‘সুন্দরবনে পর্যটকদের ঢোকা বন্ধ থাকায় একদিকে ট্যুরসংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার মানুষ জীবিকাহীন হয়ে পড়েছেন, অন?্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। আর এরই সুযোগে অপরাধীরা উজাড় করে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। শিকার করছে হরিণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটকদের জন?্য সুন্দরবন খুলে দিলে এখানে অপরাধ অনেক কমে যাবে। বনরক্ষার স্বার্থেই পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দেওয়া উচিত।’
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)’র সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জমাদ্দার বলেন, সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত কয়েক মাসে তাদের ২০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। অবিলম্বে দাবি আদায় না হলে আগামীতে খুলনা-ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই দাবি জনিয়েছেন ফেমাস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার তানজির এইচ রুবেল। তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দিলে কোনো ক্ষতি হবে না। বরং লাভই হবে। সুন্দরবনের অপরাধও বন্ধ হবে। ’
এবিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. মঈনউদ্দিন বলেন, ‘সুন্দরবনের পরিবেশের স্বার্থে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্দরবনে আবার কবে পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হবে, সে বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। তবে আগামী মাসে এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন এই বন কর্মকর্তা।

শেয়ার