খুলনায় ‘জীবানুনাশক’ই এখন জীবনের ঝুঁকি

এস এম সাঈদুর রহমান, খুলনা ব্যুরো ॥ খুলনা মহানগরের বিভিন্ন মার্কেট ও অভিজাত শপিংমলের প্রবেশ দ্বারে এখন চোখে পড়ছে জীবাণুনাশক টানেল। এমনকি কিছু কিছু অফিস ফটকেও স্থাপন করা হয়েছে এসব টানেল। মূলত: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই স্থাপন করা হয়েছে জীবাণুনাশক টানেলগুলো। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এই জীবাণুনাশকই মানবদেহের জন্য ঝুঁকি’র কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, নগরীর অভিজাত নিউ মার্কেট ও সেইফ এন্ সেইভ’ নামক শপিংমলের প্রবেশপথে টানেলে ব্লিচিং পাউডার মেশানো জীবানুনাশক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ব্লিচিং পাউডার মেশানো এসব পানি স্প্রে’র মাধ্যমে মানবদেহের বিশেষ করে চোখ-মুখের জন্য ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসব জীবাণুনাশক থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা অনেকটা ব্লিচিং পাউডারের মতিই। এমনকি এটি শরীরে লাগার পর চোখ-মুখ যন্ত্রণা করে থাকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খুলনা নিউমার্কেট ও সেইফ এন সেইভ এর সামনে জীবাণুনাশক টানেলে নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিউ মার্কেট কর্তৃপক্ষ নিজস্ব পদ্ধতিতে ও সেইফ এন্ড সেইভ কর্তৃপক্ষ ‘অরন্য টেকনোলজি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে টানেল তৈরি করেছে। তবে, টানেলে ব্যবহৃত জীবাণুনাশক তৈরিতে ইথেনসহ অন্যান্য কেমিক্যাল ‘খুলনা সাইনটেফিক স্টোর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক মাস আগেই কেনা হয়। এছাড়া ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত দ্রবনটি প্রতিদিন নতুন করে তৈরির নিয়ম থাকলেও তারা সেটি করছেন না। কয়েকশ’ লিটার একসঙ্গে তৈরি করে ড্রাম ভর্তি রেখেই শেষ না হওয়া অবদি যতদিন যায়- ব্যবহার করা হচ্ছে।
সূত্র মতে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন ও খুলনা জিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের প্রবেশদ্বারেও রয়েছে এ ধরণের টানেল। যাতে ব্যবহৃত জীবাণুনাশকের মান নিয়েও একই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এতে করে এই জীবাণুনাশক নিজেই ‘জীবানুর ঝুঁকি’ তৈরি করছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন।
নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা মঞ্জুরুল হাসান জানান, মার্কেটের দুইটি গেটে জীবানুনাশক টানেল দেয়া হয়েছে। সেখানে ড্রাম থেকে ব্লিচিং পাউডার মেশানো জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। যা শরীরে লাগলে জ্বালাপোড়া করে এবং দুর্গন্ধ লাগে। তিনি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব জীবাণুনাশক পরীক্ষা করে মান নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।
সেইফ এন সেইভ’র ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির জানান, তারা টানেল তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ‘অরন্য টেকনোলজি লিমিটেড’র নির্দেশনা মতো ৩শ’ লিটার পানির সাথে ৮০০ মিলিলিটার ইথানল মিশিয়ে জীবাণুনাশক তৈরি করেন। সেটা শেষ হওয়ার পর নতুন আরেক ড্রাম তৈরি করা হয়। তবে, এই জীবাণুনাশক মিশ্রনটি তৈরির পর কখনো ল্যবরেটরী পরীক্ষা করা হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, অতিমাত্রায় ব্লিচিং পাউডারের মিশ্রণ মানবদেহের বাহ্যিক অংশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষের অ্যালার্জিজনিত সমস্যা রয়েছে তারা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এছাড়া এই জীবাণুনাশক তৈরির পর কয়েকদিন একইভাবে রাখা হলে তা নিজেই বিষাক্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে বাইরে বের হলে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত ও মুখ ধোয়াই ভাল বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৬ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তিতে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার না করার নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, জীবাণুনাশ করার এই পদ্ধতিটি সঠিক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, ‘কোনও পদার্থ, শরীর নিঃসৃত বর্জ্য পরিষ্কার ও জীবাণুনাশ করতে স্ট্রোং ক্লোরিন ০.৫% প্রয়োজন হয়। এছাড়া প্রতিদিন নতুন করে এই দ্রবণটি তৈরি করা এবং আগের দিনের অবশিষ্ট ক্লোরিন ফেলে দেওয়া উচিত’।

শেয়ার