ভারতীয় একজন চিকিৎসক যেভাবে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হয়ে উঠলেন

সমাজের কথা ডেস্ক॥ জাতীয় নিরাপত্তা আইনে বন্দি ভারতের উত্তর প্রদেশের এক চিকিৎসককে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে এলাহাবাদ হাই কোর্ট। ৩৮ বছর বয়সী ডা. কাফিল খানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দেওয়ারও অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশের পর মঙ্গলবার রাতে তিনি ছাড়া পেয়েছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে উত্তর প্রদেশের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তৃতায় কাফিল বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী (সিএএ) বিরুদ্ধে বলেছিলেন।
সমালোচকরা সিএএকে ভারতের এখনকার বিজেপি সরকারের মুসলমানবিদ্বেষের অন্যতম নজির হিসেবে দেখে আসছেন। এ আইনকে ঘিরে ভারতজুড়ে তুমুল বিক্ষোভও হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, উত্তর প্রদেশের সরকার কাফিল খানকে যে আইনে গ্রেপ্তার করেছিল, তাতে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ মনে হওয়া যে কাউকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায়।
আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তৃতায় কাফিল ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং ‘সত্যিকারের ইস্যুগুলোকে’ এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
তিনি শিশুদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্রমাবনতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা নিয়েও কথা বলেছিলেন।
“যতই আপনারা আমাদের ভয় দেখান না কেন, আমরা ভয় পাবো না। যতই আপনারা দমন পীড়ন চালান না কেন, প্রতিবারই আমরা উঠে দাঁড়াবো,” উল্লসিত ৬০০ শিক্ষার্থীর সামনে দেওয়া বক্তৃতায় এমনটাই বলেছিলেন কাফিল।
যদিও শিশু বিশেষজ্ঞের এসব কথায় ‘হিংসাত্মক’ উপাদান পাওয়ার কথা জানায় বিতর্কিত হিন্দু নেতা যোগী আদিত্যনাথের শাসনে থাকা উত্তর প্রদেশের পুলিশ। যে কারণে বক্তৃতা দেওয়ার দেড় মাস পর কাফিলকে গ্রেপ্তার করা হয়, পাঠানো হয় জেলে।
“তিনি (কাফিল) ওই সমাবেশে থাকা মুসলমান শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উন্মাদনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন; চেষ্টা করেছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, শত্রুতা এবং বৈরি মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার,” আদালতকে এমনটাই বলেছিল উত্তর প্রদেশের পুলিশ।
মঙ্গলবার এলাহাবাদের হাইকোর্ট পুলিশের ওই বক্তব্যকে খারিজ করে দিয়েছে। তারা বলেছে, আলিগড়ে দেওয়া বক্তব্যে ড. কাফিল ‘বিদ্বেষ বা সহিংসতার প্রচার করেননি’, উল্টো নাগরিকদের ‘এক হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন’।
কর্তৃপক্ষ কাফিলের বক্তব্যের মধ্যে থেকে ‘বেছে বেছে খানিকটা অংশ পড়ে’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে বলেও ভাষ্য বিচারকদের।
“প্রথমে তাকে বানানো হয়েছিল বলির পাঁঠা, আর এখন তিনি হয়ে গেলেন রাষ্ট্রের শত্রু,” বলেছেন কাফিলের ভাই আদিল খান।
২০১৭ সালে গোরক্ষপুরের বিআরডি মেডিকেল কলেজে অক্সিজেন সরবরাহ না থাকার কারণে অন্তত ৭০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর কাফিলের নাম ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, জানিয়েছে আনন্দবাজার।
চিকিৎসাধীন শিশুদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার যোগাড় করতে কাফিল নিজের পকেটের টাকা খরচ করেছেন; ছুটে বেড়িয়েছেন একের পর এক হাসপাতালে, দোকানে। সিলিন্ডারের জন্য তিনি এমনকী একটি আধাসামরিক বাহিনীর ব্যারাকেও গিয়েছিলেন।
“২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি ২৫০ সিলিন্ডার যোগাড় করি। ২৫০। আমি জানি না, এর ফলে কতগুলো শিশুকে বাঁচানো গেছে। তবে আমি আমার সর্বোচ্চটা করেছিলাম,” বলেছিলেন কাফিল।
তবে তার এ চেষ্টার ফল হয়েছিল উল্টো। হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতির কথা অস্বীকার করে উল্টো কাফিলের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। তাকে বরখাস্ত করা হয়, পরে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু সংঘটনের’ অভিযোগে গ্রেপ্তারও করা হয়। ওই মামলার শুনানি এখনও চলছে।
গত বছরের এপ্রিলে জামিনে বের হয়ে আসেন কাফিল। চার মাস পর, সেপ্টেম্বরে বিভাগীয় তদন্তদল কাফিলকে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু সংঘটনের’ অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়। যদিও তার সঙ্গে করা অন্যায়ের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারের দিক থেকে কোনো ধরনের দুঃখপ্রকাশ করা হয়নি।
কেবল তাই নয়, ওই ঘটনায় ৪ চিকিৎসকসহ মোট ৮ হাসপাতাল কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তারা সবাই চাকরি ফিরে পেয়েছেন, পাননি কেবল ড. কাফিল খান। সরকারি বেতনেরও মাত্র অর্ধেকটা পাচ্ছেন এখন।
হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনার কয়েকদিন পর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ওই হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কাফিলের সঙ্গে বাজে ব্যবহারও করেছিলেন বলে পরে এ শিশু বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন।

“তুমি কি মনে করো, সিলিন্ডার যোগাড় করেই তুমি হিরো হয়ে যাবে?,” আদিত্যনাথ তাকে এমনটাই বলেছিলেন বলে জানান কাফিল।
অক্সিজেনের সিলিন্ডার সংগ্রহে কাফিলের ছুটে বেড়ানোর একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। ওই ভাইরাল ভিডিওই তাকে উত্তর প্রদেশের সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত করে বলে ধারণা কাফিলের।
তার সমর্থকরা বলছেন, শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সরকারের অবহেলা তুলে ধরাই কাফিল খানের জন্য কাল হয়েছে। এ শিশু বিশেষজ্ঞ যখন জেলে ছিলেন, তখন তার পরিবারের সদস্যরা বেশ কয়েকবারই যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে দেখা করে তাকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সেসব অনুরোধে কান দেননি, কেবল বলেছিলেন, “বিচার হবে।”
শিশুমৃত্যুর মামলায় জামিনে বের হয়ে এলেও পরে পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করে; এবারের অভিযোগ, কাফিল বাহরাইচের একটি সরকারি হাসপাতালে জোর করে ঢুকতে চেয়েছিলেন। সেবার ৪৫ দিন জেল খাটতে হয় তাকে। সর্বশেষ আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায় দেওয়ার তার কপালে জোটে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ তকমা।
একের পর এক বিতর্ক, মামলা, গ্রেপ্তার আর জেলখানা তিন বছরের মধ্যেই এ চুপচাপ, পড়াশোনায় মগ্ন থাকতে পছন্দ করা, ক্রিকেট ও ফটোগ্রাফি পাগল কাফিলকে আমূল বদলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তার সহকর্মীরা।
“আমি একজন চিকিৎসক। কোভিড-১৯ এর এ তা-বের বিরুদ্ধে লড়তে আমাদের আরও চিকিৎসক দরকার। আমাকে মুক্তি দিন। আমার মনে হয়, আমি এই রোগ কমাতে খানিকটা হলেও সাহায্য করতে পারবো,” জেল থেকে মোদীকে লেখা এক চিঠিতে এমনটাই বলেছিলেন কাফিল।
সমর্থকরা এ শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখছে মোদীর শাসনামলে ভারতজুড়ে যে ‘রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় দমনপীড়ন চলছে’ তার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙক্ষা থেকেই এ চিকিৎসক বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে মিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিষদগার করছেন।
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কাফিল এখন রাজস্থানের জয়পুরের একটি গেস্ট হাউসে আছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। বুধবার সকালে চার বছর বয়সী মেয়ে ও ১৮ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে কাফিলের দন্ত চিকিৎসক স্ত্রীও গোরখপুর থেকে রাজস্থানের পথে রওনা হন।
যদিও খুব বেশি সময় ‘বিরতি’ নেওয়ার ইচ্ছা নেই কাফিলের।
“আমার পরিকল্পনা হচ্ছে ভারতের কিছু বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প করা এবং সেখানকার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ভূমিকা রাখা,” মুক্তি পাওয়ার রাতেও এমনটাই বলেছেন তিনি।

 

শেয়ার