স্বজনদের আহাজারিতে ভারী পরিবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের মারপিটে নিহত তিন কিশোরের লাশ প্রায় তিন ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে একে একে পাঠানো হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে। নিহতরা সবাই বাইরের জেলার বাসিন্দা হওয়ায় রাতে স্বজনদের দেখা যায়নি। তবে গণমাধ্যমে খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে হাসপাতালের সামনে ছুটে আসেন স্বজনরা। দিনভর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে বাতাস। কেউ বুক চাপড়িয়ে, কেউ মাথায় হাত দিয়ে কেউবা কাঁদতে কাঁদতে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় জ্ঞান হারিয়েছেন। অশ্রুসিক্ত ছিলো হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগীদের স্বজনরাও। এদিকে হামলার খবরে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি অন্য কিশোরের স্বজনরা হাসপাতাল ও কেন্দ্রে ছুটে আসেন। তারাও ছিল উৎকণ্ঠিত।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরু মিয়া ছেলে রাসেল ওরফে সুজনের লাশ নিতে আসেন। যশোর হাসপাতালের মর্গের সামনে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ধর্ষণ মামলায় ছেলে রাসেলের ৬ বছরের কারাদণ্ড হলে তাকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ছেলের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। পরে রাতে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে; তাদের মধ্যে রাসেলও রয়েছে। আগামী মাসেই রাসেলের জামিন হওয়ার কথা ছিলো। তার মা সালেহা বেগম স্বপ্ন দেখতো ছেলে বাড়ি এলে এবার বিয়ে দিবে। ছেলেও কথা দিয়েছিলো ভালো হয়ে বাবার সাথে কাজ করবে। প্রায় প্রতিদিন তার মা রাতে খাবার সময়ে বলে, রাসেল বাড়ি ফিরলে বিভিন্ন রকম খাবার রান্না করে খাওয়াহবে। কিন্তু মায়ের স্বপ্নপূরণ আর হলো না। এরা তো সন্ত্রাসী (যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা) আমার ছেলেকে আর বাঁচতে দিলো না। সরকারের কাছে এই হত্যার বিচার চাই।
গত বছর মার্চে ধর্ষণ মামলার আসামি খুলনা মানিকতলা এলাকার জনির ৭ বছর কারাদণ্ড দেন আদালত। কিশোর অপরাধী হওয়ায় আদালত তাকে শুধরানোর জন্য পাঠায় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। মা রোজিনা বেগমের সাথে ছেলে জনির নিয়মিত যোগাযোগ হতো। কিন্তু বৃহস্পতিবার কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরে রাতে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন তিন কিশোর নিহতের সংবাদ। গতকাল ভোরেই উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে আসেন যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। সেখানে ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় যশোর হাসপাতাল মর্গে আসেন। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে বাতাস। পরে জানতে পারেন ছেলে গুরুতর আহত হয়েছে। ছেলের সাথে বেশিক্ষণ পুলিশ থাকতে না দিলেও যেটুকু কথা হয়েছে পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আছে টর্চার সেল। সেখানে বন্দিদের নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। এই নির্যাতন যে প্রথম সেটা কিন্তু নয় আগেও বহু নির্যাতন হয়েছে।
খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান। পরিবারের ছোট ছেলে পারভেজকে হারানোর বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গেছেন বাবা রোকা মিয়া। পাগল প্রায় স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিচ্ছে যশোর মর্গের সামনে। এসময় তিনি বলেন, ছেলে আসামি হলেও কি সন্তান বলে কথা। ছেলে বলেছিলো শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে ভালো হয়ে যাবো। বাবার সাথে পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু সে আর হলো না। ভালো হওয়াতো দূরের কথা ভালো মানুষরূপী কিছু পশু আমার ছেলেকে খুন করেছে। তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টার দিকে মায়ের সাথে শেষকথা হয় পারভেজের। সেসময় তার মায়ের কাছে সে বলে, বিভিন্ন সময়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যরা তার ওপর নির্যাতন করছে। ঠিকমতো খাবারও দেয় না তারা। ঈদের সময়ে নতুন জামা ও বিভিন্ন খাবার পাঠালেও ঠিকমতো পেতো না পারভেজ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পারভেজের এক বন্দি বন্ধুর সাথে কথা বলে রোকা মিয়া জানতে পেরেছেন, কেন্দ্রের ভিতরে একটি রুমে হাত-পা বেঁধে পারভেজকে বেদম মার দিয়েছে। ঠিকমতো চিকিৎসা না দেওয়ায় পারভেজের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি পারভেজের বাবা রোকা মিয়ার। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার চেয়েছেন। এদিকে শুক্রবার রাত ৭ টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে তিনজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

শেয়ার