যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ‘তিন হত্যা’ ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অমানুষিক নির্যাতন ও মারপিটে তিন কিশোর নিহত ও ১৫ জন আহতের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বজনরা। তারা ওই কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অত্যাচার নির্যাতনেরর নানান চিত্র তুলে ধরছেন। মুখ খুলেছেন আহত বন্দি কিশোররাও। আর হতাহতদের স্বজনদের কান্নায় যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
কিশোরদের দাবি, ওই ঘটনার সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ১৮জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকাল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদেরকে লাঠিসোটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারপিটের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে কয়েকজন মারা গেলে সন্ধ্যার দিকে তাদের লাশ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, ‘৩ আগস্টের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে আমাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। আমরা ঘটনার আদ্যোপান্ত জানানোর এক পর্যায়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্যান্য স্যাররা মারপিটে অংশ নেন।’
আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর বন্দি জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে তা বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করেন। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছতলায় ফেলে আসেন। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করেছেন।’
যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি মারুফ হোসেন ঈষান জানায়, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’ সে অভিযোগ করে, ‘প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলেন, তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।’
ঈষানের মামা রমজান আলী জানান, ইতোপূর্বেও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নির্যাতন মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। জানালার বাইরে হাত বের করে ধরে রেখে পেছনে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। নিহত পারভেজের চাচা সেলিম রেজা বলেন, তারা পারভেজ হত্যার বিচার চান। বৃহস্পতিবার সকালেও পারভেজ ফোন করে তার মা’কে বলেছে, ঈদের সময় পাঠানো জামাকাপড়, মাংস সে পায়নি। সেখানে ঠিকমত খাবার দেয়া হয় না। কথায় কথায় মারপিট করা হয়। এজন্য বাড়ি ফিরতে সে মায়ের কাছে আকুতিও জানিয়েছিল। এখন লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে পারভেজ। শুধু পারভেজ নন, অন্য নিহতদের স্বজনরাও শুক্রবার ভিড় করেছিলেন যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। সেখানে তাদের আহাজারিতে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার গভীররাতে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে মর্মান্তিক ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। আমরা যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করি, তারা ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে বিষয়টি অবহিত হয়েছি। যেকারণে মূল ঘটনা জানা জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তারাই এই ঘটনার মূল সাক্ষী। মৃত্যুপথযাত্রী কেউই মিথ্যা কথা বলে না। তাদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে তাদের বিষয় গুরুত্ব পাবে।’
তিনি আরও ‘এখানে আসলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। আজকের ঘটনাটি একপক্ষীয়।’ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাদী যে কেউ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের স্বজন অথবা তৃতীয় কোনও পক্ষ; সবশেষ কাউকে না পাওয়া গেলে পুলিশ তো রয়েছে। তদন্তাধীন ঘটনা হওয়ায় এরচেয়ে বেশিকিছু বলতে তিনি রাজী হননি।

 

 

শেয়ার