যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন হত্যাকাণ্ড ‘খুন করেছেন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা’

 পুলিশ হেফাজতে ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী 
তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি তিন কিশোর খুনের ঘটনায় নতুন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কিশোরদের দুই গ্রুপের মারামারিতে নয়, কর্মকর্তারা ঠাণ্ডা মাথায় পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে পুলিশ ও আহতের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। আর এজন্য শুক্রবার ওই কেন্দ্রের ১০ কর্মকর্তা- কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। অজ্ঞাত আসামিদের নামে গতকাল রাতে মামলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোরদের দুই গ্রুপের মারামারি হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ওই ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে কর্মকর্তারা অন্তত ১৭ জনকে বেধড়ক মারপিট করে। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। এরমধ্যে নিহত হয় তিনজন। এরপর সন্ধ্যারাতে এক এক করে তাদের লাশ হাসপাতালে নেয়া হয়।
নিহতরা হলেন, বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্বপাড়ার নান্নু পরমানিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), একই জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮)।
শুক্রবার রাতেই ৪টি ধাপে যশোর যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থেকে ১৪ জন আহতদের ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলেন, লালমনিরহাটের মফিজুর রহমানের ছেলে মোস্তাফা কামাল (১৬), হৃদয় (১৫), খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকীর ছেলে আরমান (১৫), বাগেরহাটের চিতলমারী এলাকার লিমন খান (১৫), যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর এলাকার সবুজ হোসেন ঈশান (১৫), জাবেদ (১৭), ইকরামুল (১৫), নাটোরের খুরশাদপুর এলাকার মিলন হোসেন ছেলে শাকিব হোসেন (১৫), চুয়াডাঙ্গার দৌলতপুর এলাকার ইস্তিয়াকের ছেলে পাভেল (১৪), নুর আলম (১৬), লিমন (১৫), আব্দুল আলীম (১৫), রাব্বি (১৪), নাঈম (১৬)। আর সর্বশেষ শনিবার বেলা ১১ টার দিকে বগুড়ার সুজাদপুর এলাকার সাইফুল ইসলামের ছেলে রুপক হোসেনকে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের সবাই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
নিহত পারভেজ হাসান রাব্বি’র পিতা গতকাল রাতে কোতোয়ালি থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন। মামলায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে। তবে আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
শুক্রবার যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, দুইপক্ষের বক্তব্যে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত সংঘর্ষ নয়, মারপিটেই তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে। কেন্দ্রের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে, সেখানে অভ্যন্তরীন শাস্তির রেওয়াজ আছে। সেটি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি আমরা যাচাই বাছাই করছি। হতাহতের ঘটনায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোস্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানসহ ১০ কর্মকর্তা- কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন আরও বলেন, নিহত রাব্বির পিতা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের নামে মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের নাম উল্লেখ করেননি। আসামি কারা হতে পারে, সেটি যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীররাতে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে মর্মান্তিক ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। আমরা যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করি, তারা ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে বিষয়টি অবহিত হয়েছি। যেকারণে মূল ঘটনা জানা জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তারাই এই ঘটনার মূল সাক্ষী। মৃত্যুপথযাত্রী কেউই মিথ্যা কথা বলে না। তাদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে তাদের বিষয় গুরুত্ব পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আসলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনাটি একপক্ষীয়।’ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাদী যে কেউ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের স্বজন অথবা তৃতীয় কোনোও পক্ষ; সবশেষ কাউকে না পাওয়া গেলে পুলিশ তো রয়েছে। তদন্তাধীন ঘটনা হওয়ায় এরচেয়ে বেশিকিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, কিভাবে এই কিশোররা হতাহত হলো তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পরই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এদিকে, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তিন বন্দি নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহতের ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই কমিটি গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির দুই সদস্য হলেন- সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) যুগ্মসচিব সৈয়দ মো. নূরুল বাসির ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এমএম মাহমুদুল্লাহ।
মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে কমিটির পাঁচটি কার্যপরিধি উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো- সরেজমিনে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে এ নৃশংস খুনের নেপথ্য সকল সূত্র উদঘাটন করতে হবে। এই ঘটনার সাথে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কোনো কর্মকর্তা- কর্মচারীর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা বা সম্পৃক্ততা আছে কি না যাচাই করতে হবে। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রে অবস্থানরত নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা কি ছিল তা যাচাই করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক ও অন্যান্য কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে কোনোরূপ উদাসীনতা, অবহেলা, গাফিলতি ও ব্যর্থতা ছিল কি না তা যাচাই করতে হবে। এছাড়াও উপপরিচালক জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কোনোরূপ ব্যর্থতা ছিল কি না তাও যাচাই করতে হবে। এই বিষয়গুলো ছাড়াও অন্যকোনো বিষয় তদন্ত কমিটির দৃষ্টিগোচর হলে সেই বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি কিশোর বন্দিরা নির্যাতনের বর্ণনা করেন। তারা জানান, ঘটনার সূত্রপাত ৩ আগস্ট, ঈদের দুদিন পর। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আনসার সদস্য নূর ইসলাম কয়েকজন কিশোরের চুল কেটে দিতে চান। কিন্তু কিশোররা চুল কাটতে রাজি না হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন, ওই কিশোররা নেশা করে। এর প্রতিবাদে ওইদিন কয়েকজন কিশোর তাকে মারপিট করে। আহত কিশোরদের দাবি, ওই ঘটনার সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ১৮ জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকাল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদেরকে লাঠিসোটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারপিটের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে কয়েকজন মারা গেলে সন্ধ্যার দিকে তাদের লাশ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
যশোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, ‘৩ আগস্টের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আমাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। আমরা ঘটনার আদ্যোপান্ত জানানোর একপর্যায়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্য স্যাররা মারপিটে অংশ নেন।’
আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর বন্দি জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে তা বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করেন। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছতলায় ফেলে আসেন। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করেছেন।’
যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈষান জানায়, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’
সে অভিযোগ করে, ‘প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলেন, তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।’
আহতরা জানায়, মারধর করে তাদের এখানে সেখানে ফেলে রাখা হয়। পরে একজন করে মারা গেলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে চার দফায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ দীর্ঘসময় পর সন্ধ্যা সাতটায় রাব্বি, সুজন ও নাঈমকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অমিয় দাস বলেন, দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি মরদেহ আসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে। সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে নাঈম হাসান, সাড়ে ৭টায় পারভেজ হাসান এবং রাত ৮টায় আসে রাসেলের মরদেহ। এ চিকিৎসক বলেন, ‘একজনের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অন্যদের শরীরের আঘাতের কোনো চিহ্ন এখনও শনাক্ত হয়নি।
কেন্দ্রের প্রশিক্ষক মুশফিক দাবি করেন, কয়েকদিন আগে সংশোধনাগারে শিশুদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়। ওই ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে নাঈম, রাব্বি ও রাসেল হোসেন গুরুতর আহত হন। কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদও দাবি করেন, সংঘর্ষে দশজন আহত হয়। এ সময় তারা সাংবাদিকদের কাছে আরও দাবি করেছিলেন, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি পাভেল ও রবিউলের নেতৃত্বাধীন দুটি গ্রুপ রয়েছে। এই দুই গ্রুপ দুপুর দুই টার দিকে লাঠি ও রড নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কর্মকর্তারা ঠান্ডা মাথায় তাদের পিটিয়ে হত্যা করেছে।
এদিকে, নিহতের স্বজনরা খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে যশোরে আসে। সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। নিহত রাব্বির মা এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, বালকদের জন্য দেশে দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। যার একটি গাজীপুরের টঙ্গিতে, অন্যটি যশোর শহরতলীর পুলেরহাটে। কিশোর অপরাধীদের জেলখানায় না পাঠিয়ে সংশোধনের জন্য এই উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়।

 

শেয়ার