যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংঘর্ষ, ৩ বন্দি নিহত

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংঘর্ষে তিন কিশোর নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ১৪ জন। বৃহস্পতিবার দুপুর দুই টার দিকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অভ্যন্তরে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৪ ঘণ্টা গোপন রেখে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার পর দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে ৩টি লাশ যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।
নিহতরা হলেন, বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্ব পাড়ার নান্নু পরমানিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), একই জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮)। নিহত রাব্বির রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ১১৮৫৩। আর রাসেল ও নাঈমের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার যথাক্রমে ৭৫২৪ ও ১১৯০৭। নাঈম হোসেন ধর্ষণ এবং রাব্বি হত্যা মামলার আসামি ছিল। যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
যশোর পুলিশের ডিএসবি ডিআই-১ পুলিশ পরিদর্শক এম মশিউর রহমান জানান, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বন্দি পাভেল ও রবিউলের নেতৃত্বাধীন দুটি গ্রুপ রয়েছে। এই দুই গ্রুপ দুপুর দুই টার দিকে লাঠি ও রড নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়। এতে মোট ১৪ জন আহত হয়। নিহত হয় রাব্বি, রাসেল ও নাঈম নামে তিন কিশোর। এর মধ্যে পাভেল গ্রুপের সদস্য রাব্বি ও রাসেল আর রবিউল গ্রুপের সদস্য নাঈম।
এদিকে, দুপুরে ঘটনা ঘটলেও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ দীর্ঘসময় পর সন্ধ্যা সাতটায় রাব্বি, সুজন ও নাঈমকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অমিয় দাস বলেন, দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি মরদেহ আসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে। সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে নাইম হাসান, সাড়ে ৭টায় পারভেজ হাসান এবং রাত ৮টায় আসে রাসেলের মরদেহ। এ চিকিৎসক বলেন, এক জনের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অন্যদের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন এখনও শনাক্ত হয়নি। এদিকে, তিন কিশোরের মরদেহ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে বলে খবর পেয়ে সেখানে সংবাদকর্মীরা ভিড় জমান। কিন্তু হাসপাতালে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কাউকে পাওয়া যায়নি। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদের নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সশরীরে উন্নয়ন কেন্দ্রে যাওয়া হলেও কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা জানান, ভেতরে পুলিশ ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ।
এক পর্যায়ে সংশোধনাগারের প্রশিক্ষক মুশফিক জানান, কয়েকদিন আগে সংশোধনাগারে শিশুদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়। ওই ঘটনার জেরে গতকাল দুপুরের পর আবার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে নাইম, রাব্বি ও রাসেল হোসেন গুরুতর আহত হন। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, সংঘর্ষে তিন জন মারা গেছেন। ১৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ১৪ জন আহত ও ৩ জন নিহতের বিষয়টি যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীনও নিশ্চিত করেছেন। তিনি সন্ধ্যায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
অন্যদিকে ঘটনার পর সন্ধ্যায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যান যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেনসহ পুলিশের কর্মকর্তারা। তারা পরিস্থিতি শান্ত করেন। কিভাবে ঘটনা ঘটে এবং ঘটনার বিষয়ে কর্মকর্তাদের সাথে তারা বৈঠক করেন। দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সেখানে অবস্থান করেন। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এসে পৌছান পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, বালকদের জন্য দেশে দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। যার একটি গাজীপুরের টঙ্গিতে, অন্যটি যশোর শহরতলীর পুলেরহাটে। কিশোর অপরাধীদের জেলখানায় না পাঠিয়ে সংশোধনের জন্য এই উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর এই কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক। যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রায়ই অঘটন ঘটে। লাশ উদ্ধার, মারপিটের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম জেঁকে বসেছে। এর আগে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি এই তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অবস্থার যে উন্নতি হয়নি; বরং অবনতি হয়েছে, তিন লাশ উদ্ধারের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হলো।

 

শেয়ার