ছেলে কাব্য’র জন্মদিনে কেট কাটা হলো না বাবা-মায়ের
ঝিকরগাছায় কাভার্ড ভ্যান কেড়ে নিলো দুই কলেজছাত্রের প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে শহরের মিশনপাড়া এলাকার কলেজ পড়–য়া কাব্য দাসের ২৫ তম জন্মদিন ছিল গতকাল। জন্মদিনে প্রতিবারই ঘটা করে উদযাপন করলেও এবার করোনার কারণে পারিবারিকভাবেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলো মা কবিতা দাস। ছেলে কাব্য দাসের পছন্দমতো খাবারও রান্না করা হয়েছিলো। কিন্তু জন্মদিন উদযাপন করা হলো না কাব্য দাসের। কাভার্টভ্যানের চাকায় পিষ্ট হলো কাব্য দাসের প্রাণ। মঙ্গলবার বিকালের দিকে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছার বেনেয়ালি গ্রামের গির্জার সামনে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক নিহত হয়। তাদের মধ্যে কাব্য দাস এখনজন। একই ঘটনায় প্রাণ যায় তার আরেক বন্ধু কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয়। যে বাড়ি সন্তান কাব্যকে ঘিরে আনন্দ আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে এখন বিষাদের ছায়া, সন্তান হারানোর হাহাকার। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন বাবা-মা।
দুর্ঘটনায় নিহত কাব্য দাস যশোর শহরের মিশনপাড়া এলাকার সংস্কৃতি জন ও যশোরের পরিচিত মুখ উদীচীর সহসভাপতি দিলিপ দাসের বড় ছেলে ও ঢাকা কর্মাস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। আর কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয় শহরের সার্কিট হাউজ পাড়ার মাহবুবুর হকের ছেলে। কাজী মুশফিক মাহামুদ প্রিয় মাগুরা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মতে, মঙ্গলবার বিকেলে যশোর থেকে মোটরসাইকেলে বেনাপোলে যাচ্ছিলেন মুশফিক ও কাব্য। বেলা ৩ টার দিকে ঝিকরগাছার বেনেয়ালি গির্জার সামনে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া কাভার্টভ্যান ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখে।
নিহত কাব্যের ছোট ভাই কল্প দাস সমাজের কথাকে জানান, করোনা কারণে কলেজ বন্ধ হওয়ায় বড়ভাই কাব্য ঢাকা থেকে বাড়ি আসেন। বাড়ি আসার পরেই মাস খানিক আগে মোটরসাইকেল কেনার বায়না ধরেন। তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেয় পরিবার। মঙ্গলবার কাব্য’র জন্মদিন ছিলো। পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এবার জন্মদিন পালন করার সকল প্রস্তুতি নিয়েছিলো মা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেই কেককাটাসহ নানা আয়োজনে জন্মদিন পালন করতো সবাই। কিন্তু বন্ধুদের বায়নায় বেনাপোলে ঘুরতে যাচ্ছিল কাব্য। কিন্তু ঝিকরগাছায় দ্রুতগতির একটি ঘাতক কাভার্টভ্যান কাব্যসহ তার আরেক বন্ধুকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তারা।
মঙ্গলবার শহরের কাব্যের বাড়ি মিশনপাড়া এলাকার বাড়িতে যেয়ে দেখা যায়, জন্মদিনের সাজগোজও করা হয় কাব্যের রুমে। গতবারের চেয়ে এবারের জন্মদিনের অনুষ্ঠান জৌলুসময় করতে না পারলেও বাড়িতে খাবার রান্নার পাশাপাশি বড় কেক আনা হয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলের মৃত্যুতে মা-বাবাসহ স্বজন প্রতিবেশীদের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে গেছে। অনেকেই প্রিয় স্বজন হারানোর সংবাদ শুনে পাগলপ্রায় মা-বাবা কে স্বান্তনা দিতে ছুটে এসেছেন। কাব্যের মায়ের চারপাশে স্বজনদের আহাজারি। এসময় পাগল প্রায় সন্তান হারানো মা বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘ফিরে আর বাবা, ফিরে আয়, বারবার বলেছি গাড়ি আস্তে চালাবি। কথা শুনে না সে। তোমরা আমার সুনারে ফিরিয়ে দাও।’
কাব্যের বাবা দিলিপ দাস জানান, ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করার বড় স্বপ্ন ছিলো তার। ক্যান্টম্যান্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর তাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকার কর্মাস কলেজে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে থাকতো সে। তবে করোনার কারণে সে বাড়িতেই অবস্থান করছিলো। মঙ্গলবার তার জন্মদিন ছিলো। সকল প্রস্তুতি রাখা হয়েছিলো। তার পছন্দের বিভিন্ন খাবার রান্না করেছিলো মা কবিতা দাস। প্রিয় খাবারগুলোও খাওয়া হলো না কাব্যের। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার বারবার আকুতি করছিলেন
এ দিকে দুর্ঘটনায় আরেকজন নিহত কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয়’র বাড়িতেও শোকের ছায়া নেমে এসছে। পরিবারের ছোট ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা মাহবুবুর হক।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক জানান, ঘাতক কাভার্টভ্যানটি ও চালকদের আটক করা যায়নি। তবে পুলিশ আটকে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরো বলেন, মরদেহের দুটি সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।
যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
উদীচী যশোর জেলা সংসদের সহ-সভাপতি জন দীলিপ দাসের পুত্র কাব্য দাস গতকাল দুপুরে ঝিকরগাছায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তার মৃত্যুতে শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারিকুল ইসলাম তারু ও সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলুসহ সংগঠনের সকল নেতৃবৃন্দ।
বিবর্তন যশোরের শোক
উদীচী যশোর জেলা সংসদের সহ-সভাপতি জন দীলিপ দাসের পুত্র কাব্য দাস গতকাল দুপুরে ঝিকরগাছায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তার মৃত্যুতে শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন বিবর্তন যশোরের সভাপতি সানোয়ার আলম খান দুলু ও সাধারণ সম্পাদক আতিকুজ্জামান রনিসহ সংগঠনের সকল সদস্যবৃন্দ।

শেয়ার