সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও দু’বছর

খুলনা ব্যুরো ॥ সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১১৪টি। চলতি ২০২০ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে প্রথম চালু হয় বিশ্ব বাঘ দিবস। বুধবার (২৯ জুলাই) যদিও সীমিত আকারে দিবসটি পালিত হলো। কিন্তু সর্বশেষ বাঘের সংখ্যা জানতে হলে আরও দু’বছর অর্থাৎ ২০২২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের গবেষণায় সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। পরবর্তীতে ১৫ সালে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা করা হয়। এতে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাঘ প্রকল্প ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ শুরু করে। যার ফলাফল ২০১৮ সালেই প্রকাশ করা হয়। ওই ফলাফলে সুন্দরবনের ১১৪টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
এই সূত্র জানান, সর্বশেষ বাঘশুমারিতে সুন্দরবনের ২৩৯টি জায়গায় গাছের সঙ্গে ৪৯১টি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। ২৪৯ দিন ধরে চালু রাখা ক্যামেরাগুলোতে বাঘের ২ হাজার ৫০০টি ছবি পাওয়া যায়। ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ১১৪টি বাঘ থাকার ধারণা দেন।
সুন্দরবন বিভাগের পশ্চিম বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল-আল-মামুন বলেন, বাঘ রক্ষায় বাঘের আবাসস্থল সুরক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ চলছে। আগামী ২০২২ সালে আবারও বাঘ প্রকল্প ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে গণনা করার কথা রয়েছে। এর আগে বাঘের আবাসস্থল সুরক্ষা ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ৩ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনার আওতায় ন্যাশনাল টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে।
বনবিভাগের কর্মকর্তারা জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বলছেন, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৪ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাঘ বিচরণ করে। এদের বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র বাগেরহাটের কটকা, কচিখালী ও সুপতিসহ খুলনার নীলকমল, পাটকোষ্টা ও গেওয়াখালী এবং সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ, দোবেকি ও কৈখালী এলাকা।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্নভাবে ২২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুস্কৃতকারীদের হাতে ১০টি, জনতার গণপিটুনিতে পাঁচটি, স্বাভাবিকভাবে ছয়টি এবং ২০০৭ সালের সিডরে একটি বাঘের মৃত্যু হয়। এ সময়ের মধ্যে ১৬টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম বিভাগের আওতাধীন এলাকায় ১৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে গণপিটুনিতে নয়টি এবং বার্ধক্য ও অসুস্থতাজনিত কারণে সাতটি বাঘের মৃত্যু হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাঘের চলাচলের এলাকাতে মানুষের বিচরণ, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়া, শিকারের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলবায়ুগত পরিবর্তন, ঝড় বাদলে বাঘের আশ্রয়স্থলের ক্ষতি ইত্যাদি নানা কারণে বাঘের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা পড়ছে। এছাড়াও চোরা শিকারীর গুলিতে বা ফাঁদে নিহত বা আহত হওয়া, পিটিয়ে হত্যা, বাঘের বাচ্চা চুরি, নানা রোগ বালাইয়ে অসুস্থ হওয়া ইত্যাদি কারণও রয়েছে।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবনের বাঘ কমে যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততাসহ নানা কারণে বাঘ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার বন বিভাগের নিরাপত্তা দিতে না পারা, শিকারীদের হানা, খাদ্য সঙ্কটে বাঘ বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসা, আর পিটুনিতে মৃত্যু হচ্ছে।
সুন্দরবন বিভাগের পূর্ব বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত টাইগার কনজারভেশন কর্মসূচি অনুমোদন হলে বাঘসহ হরিণ ও শুকর গণনা ও সুরক্ষার আওতায় আসবে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় সাবেক বন কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান বলেন, টাইগার কনজারভেশন কর্মসূচির খসড়া জমা দেয়া হয়েছে। এটি অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে ৪ বছরে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বাঘ, হরিণ, শুকরসহ সুন্দরবনের প্রাণী গণনা এবং বনকর্মী ও আশপাশ এলাকার জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ প্রদান, সামগ্রিক বিষয় নিয়ে গবেষণাসহ কিছু কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে জানুয়ারিতে থাইল্যান্ডের হুয়ানে অনুষ্ঠিত হয় টাইগার রেঞ্জ দেশসমূহের ‘এশিয়া মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স’। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত হয় প্রতিবছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হবে। সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণে ৯ দফা পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা।

শেয়ার