বদলে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা

বদলে যাচ্ছে জীবন, বদলে যাচ্ছে জীবিকা, এমনকি চেহারাও। হঠাৎ করে যদি কাউকে আপাদমস্তক পিপিই পরিহিত, মাথায় পলিথিনের টুপি কিংবা প্লাস্টিকের ঢাকনি, গগলস, মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ইত্যাদিসহ দেখা যায় তাহলে তাৎক্ষণিক প্রতীয়মান হয় যে, বুঝিবা মঙ্গলগ্রহ থেকে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে অকস্মাৎ নেমে এসেছে কোন নভোচারী! করোনাভীতি অনেক মানুষকে রোগ প্রতিরোধক হিসেবে এ জাতীয় নভোচারী সদৃশ পোশাক পরতে বাধ্য করেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। অনেকে যদি তা নাও পরেন নিদেনপক্ষে মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, মাথায় পলিথিনের টুপি তো পরেনই। তদুপরি মুখে মাস্ক পরা অনেকটা বাধ্যতামূলকও বটে; তা না হলে গুনতে হবে জরিমানা। ফলে বর্তমানে করোনা সংক্রমণকালে প্রতিদিনের চেনা মানুষ হয়ে যাচ্ছে অচেনা। যানবাহনে কিংবা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে অথবা অফিস-আদালতে গেলে চট করে কাউকে চেনা যায় না সহজে। ফলে আগের মতো সৌজন্য বা সভ্যতা-ভব্যতা অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। বুকে বুকে কোলাকুলি কিংবা উষ্ণ করমর্দন তো বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। এখন চেনা পরিচিতদের মধ্যেও হাই হ্যালোসহ আদাব সালাম বিনিময় প্রায় বন্ধ। কবে নাগাদ পুরনো এসব আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার মানুষের মধ্যে আবার ফিরে আসবে অথবা আদৌ আসবে কিনা কে জানে। একদিন করোনার টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হলেও প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই ‘জবরজং’ পোশাক অন্তত মুখের মাস্ক সরবে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তার সরলার্থ দাঁড়ায়, অচিরেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত হতে চলেছে পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী। নিদেনপক্ষে মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, চোখে গগলস ইত্যাদি। এর জন্য বাড়তি খরচও গুনতে হচ্ছে মানুষকে। এমনও হতে পারে যে, আগামীতে এসব পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে ফ্যাশনের জগতেও।
এর বাইরেও রয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। করোনা বিশ্ববাসীর জন্য যত না হন্তারক ব্যাধি হয়ে উঠেছে, ততোধিক হয়েছে অর্থনীতির চাকা প্রায় স্থবির করে দেয়ার কারণ হিসেবে। করোনার কারণে বিশ্বের প্রায় সব শিল্প-কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রায় সব রকম যানবাহন, এমনকি উড়োজাহাজ চলাচল পর্যন্ত বন্ধ। মানুষের যাতায়াত, চলাচল, হাট-বাজার, জনসমাবেশ ইত্যাদিও বন্ধ প্রায়। ফলে ব্যাস্টিক ও ব্যক্তির অর্থনীতির চাকা প্রায় অবরুদ্ধ। আয়-রোজগার বন্ধ। অফিস-আদালত বন্ধ। তবে জীবনে বেঁচে থাকার অনিবার্য তাগিদে দৈনন্দিন ক্ষুণ্ণিবৃত্তির চাকা বন্ধ থাকা বা বন্ধ রাখার উপায় নেই। ফলে প্রত্যেকেরই পেটে দানা-পানি কিছু না কিছু দিতে হচ্ছেই। তবে মানুষের খাদ্যাভাস পাল্টেছে অনেকটাই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই হোটেল-রেস্তরাঁ, ফাস্টফুডের দোকান ইত্যাদি বন্ধ। ফলে ধস নেমেছে খাবারের ব্যবসায়। বাধ্য হয়েই মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে ঘরে তৈরি খাবারের ওপর। দৈনিক খেটে খাওয়া মানুষদের নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারী ত্রাণ, অনুদান ও সাহায্যসামগ্রীর ওপর। এর সঙ্গে বাড়তি খরচ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কিছু না কিছু ওষুধপত্র ও পথ্য, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, ডেটল, স্যাভলন, ডিডিটি পাউডার ইত্যাদি উপকরণে।
করোনা মহামারী বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিক অর্থনীতির স্বভাব বদলে দিয়েছে। যে হারে আয় ও ধনবৈষম্য বাড়ছে তাতে মানুষে মানুষে যেমন ব্যবধান রচিত হচ্ছে; তেমনি সামাজিক দূরত্ব ও সুরক্ষার নামে ব্যক্তি এবং পরিবারেও সৃষ্টি হচ্ছে অনতিক্রম্য ব্যবধান। এমনকি পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, সংশয়, সামাজিক ও মানসিক টানাপড়েন ইত্যাদি। করোনা সংক্রমণের ভীতিতে স্বামীকে স্ত্রী, স্ত্রীকে স্বামী, মা-বাবাকে সন্তানের হাসপাতালসহ পথে-ঘাটে ফেলে যাওয়ার একাধিক খবর তো আছেই। এর পাশাপাশি আছে করোনার তীব্র সংক্রমণে ফুসফুস, লিভার, কিডনিসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহানির খবর। সেইসঙ্গে মানবিক ও মানসিক বৈকল্য, মনঃপীড়ন, অমানবিকতা ইত্যাদি। করোনা সংক্রমণ দীর্ঘায়িত ও প্রলম্বিত হলে আগামীতে এই প্রভাব আরও বাড়বে এবং গভীর ক্ষত রেখে যাবে দেশে দেশে পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে, সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অবশ্য এই মহামারী বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সবাইকে লড়তে হবে এক সঙ্গে, এক কাতারে। এর কোন বিকল্প কিংবা অন্যথা নয়। সুতরাং করোনার এই আপাত বাধা-বিঘœ ও বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই বিশ্ব মানবাত্মাকে এক সঙ্গে একসূত্রে গাঁথার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালাতে হবে এখন থেকেই। তা না হলে মানবসভ্যতা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে আগামীতে।

শেয়ার