বাবার রাজনীতির ধারায় ‘অবিচল ছিলেন’ মোহাম্মদ নাসিম

জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সুযোগ্য সন্তান, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি সরকারি, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কাজে আসতেন যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এ অঞ্চলের একমাত্র বিমানবন্দর যশোরে হওয়ায় যশোর হয়ে বহুবার তিনি যাতায়াত করেছেন। দেখা করেছেন তার প্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে। ডেকে কথা বলেছেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে। এ অঞ্চলের রাজনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েছেন; দিয়েছেন পরামর্শ। বছর দুয়েক আগে যশোর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সাথে একান্তে কথা বলেন তিনি। এ ছবি আজ শুধুই স্মৃতি

সমাজের কথা ডেস্ক॥ মোহাম্মদ নাসিমকে অকালে হারিয়ে বেদনাহত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা বলছেন, এম মনসুর আলী যেভাবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে কাজ করে গেছে, তার ছেলে নাসিমও তেমনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সামনে থেকে লড়েছিলেন।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ব্রেইন স্ট্রোকে শনিবার মৃত্যু হয় নাসিমের। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
সংসদ সদস্য নাসিম আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীতে ছিলেন, ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করছিলেন তিনি।
নাসিমের মৃত্যুর খবরে শোকাহত বর্ষীয়ান রাজনীতিক, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নাসিমের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দেশের জন্য ক্ষতি। সে একদিকে আওয়ামী লীগের নেতা এবং অন্যদিকে ১৪ দলের মুখপাত্র ছিল। দেশ গঠনে সমস্ত সংগ্রামে, সম্স্ত কাজে সে জড়িত ছিল।”
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলীর ছেলে নাসিম সংসদে পঞ্চমবারের মতো সিরাজগঞ্জের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
আমু বলেন, “করোনাভাইরাসের সঙ্কটেও সে নিজের হাতে ত্রাণ দেওয়া এবং সমস্ত কাজে যুক্ত ছিল বলেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। নাসিমের মৃত্যু মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর।”
গত শতকের ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নাসিম স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুবলীগের সভাপতিম-লীর সদস্য হন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর কারাগারে মনসুর আলীকেও হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন নাসিম। তখন কারাগারেও যেতে হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পরও বন্দি করা হয়েছিল তাকে।
সে কথা স্মরণ করে বর্ষীয়ান আরেক রাজনীতিক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সে ছিল জাতীয় নেতা, তার একটা বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল। সে সংগ্রামী নেতা ছিল, জেল-জুলুম-অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিল।
“১/১১ এর সময় তাকে গ্রেপ্তার করলে জেলের মধ্যে তার স্ট্রোক হয়। শারীরিক এই অবস্থা নিয়ে সারা বাংলাদেশ সফর করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করে। সে অনেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল। ১৪ দলে মুখপাত্র হিসেবে বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেছে। আমি মর্মাহত, বেদনাহত যে নাসিম এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।”
১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম। তখন সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্বও পান তিনি। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক।
শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান নাসিম। পরের বছর মার্চে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাকে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নাসিম এক সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। পরে তাকে করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজপথে আন্দোলনে থাকা সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিমের উপর পুলিশের নিপীড়ন দেশে আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে।
তখন পুলিশের লাঠিপেটায় নাসিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরীও রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিলেন। তাদের সেই রুখে দাঁড়ানোর দৃশ্য পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের শক্তি যুগিয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
নাসিমের মৃত্যুতে বেদনার সঙ্গে সেই ঘটনা স্মরণ করছেন মতিয়া চৌধুরী, যিনি নাসিমের সঙ্গে বারবার মন্ত্রিসভায় থাকার পর দলের সভাপতিম-লীতেও একসঙ্গে রয়েছেন।
মতিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৩রা নভেম্বরের বিয়োগান্তর ঘটনায় সে (নাসিম) মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেই পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করে রাজনীতিতে তার বাবার ধারা, দেশের জন্য কাজ করা, সেটা সে প্রমাণ করেছে। সে ছিল অবিচল, বিশ্বস্ত। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে জেল-জুলুম, নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করে গেছে।”
তিনি বলেন, “অনেকেই ঝামেলাহীন জীবন-যাপন করেছে, কিন্তু নাসিম সেটা করেনি। রাজনৈতিক কর্মকা- বিশেষ করে ১৪ দলের সকল কর্মকা-ে সব সময় সঙ্গে জড়িত থেকে সবাইকে এক জায়গায় এনে কাজ করানোটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করেছে।
“এখানে নানান মত, নানান পথের লোকজন আছে। সবাইকে এক জায়গায় করা, এটাতে নাসিমের অবদান ছিল অসীম, যা সে করে গেছে সফলতার সঙ্গে।”
“আজকে তার অকাল মৃত্যু। আমি অকাল মৃত্যুই বলবো, কারণ আমাদের সামনে নাসিমরা যখন চলে যায়, এটাকে আমরা অকাল মৃত্যুই বলব। দেশের নিঃস্বার্থ একনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা এবং মাঠের কর্মী ছিল সে, তাকে হারালাম “ বলেন মতিয়া।
মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন, “গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্বৈরাচার-সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ে মোহাম্মদ নাসিমের তেজদীপ্ত ভূমিকা আগামী প্রজন্মকে সর্বদা অনুপ্রেরণা জোগাবে।”
এক শোক বার্তায় তিনি আরও বলেন, “মোহাম্মদ নাসিম দীর্ঘজীবন ধরে গণমানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সাম্য ভিত্তিক প্রগতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
“তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণ একজন সৎ, ত্যাগী, নিষ্ঠাবান, অনুসরণযোগ্য এক অকৃত্রিম সুহৃদকে হারালো।”

শেয়ার