যশোরে ঋণের কিস্তি আদায়ে এনজিওদের চাপ

মাইক্রো ক্রেডিট অথরিটির হুশিয়ারি ‘থোড়াই কেয়ার’

কিস্তি
ফাইল ফটো

সালমান হাসান রাজিব
‘জুনে কিস্তি নিলে লাইসেন্স বাতিল’-এমনই কড়াকড়ি হুশিয়ারি করেছে মাইক্রো ক্রেডিট অথরিটি (এমআরএ)। এমন কড়া সর্তকতার পরও যশোরে ক্ষুদ্র ঋণ আদায়ে এনজিও তৎপর রয়েছে। ফোনের মাধ্যমে ছাড়াও বাড়িতে এসে ঋণের কিস্তির তাগাদা দিচ্ছে এনজিও কর্মীরা। তাৎক্ষণিক দিতে অপারগতা জানালে পরের সপ্তাহ থেকে পরিশোধের জন্য বলা হচ্ছে।
ঋণ গ্রহীতারা বলছেন, জোর জবরদস্তি না করলেও কিস্তির জন্য তাদের একধরণের চাপের ভেতর রাখছে বিভিন্ন এনজিও। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সাথে এনজিও কর্মীদের দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, চলতি জুন মাসেও ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি না আদায়ের ব্যাপারে বিধিনিষেধ জারি করেছে মাইক্রো ক্রেডিট অথরিটি (এমআরএ)। জু?নে এন?জিও ঋণের জন্য চাপ দি?লে লাই?সেন্স বা?তি?লে?র কড়া হুশিয়ারিও দিয়েছে। কিন্তু এসব হুশিয়ারির তোয়াক্কা না করে ঋণ আদায়ে মাঠে নেমে পড়েছে অনেক এনজিও।
যশোরের বিভিন্ন এলাকায় এনজিও কর্মীদের ঋণ আদায়ের এমন অপতৎপরতা নিয়ে মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে করোনার এই দুর্দিনে এনজিওর ঋণ আদায়ের এমন তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা চলছে। তারপরও এসবের কিছুই জানেন না যশোরের জেলা প্রশাসন।
তবে প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, চাপ দিয়ে ঋণ আদায়ের বিষয়ে কোন অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোন ছাড় দেওয়া হবে না। মুঠোফোনে জেলার প্রশাসনিক প্রধান ডিসি মোহাম্মদ শফিউল আরিফের কাছে জানতে চাইলে বলেন, এখন পর্যন্ত এই ব্যাপারে কেউ অভিযোগ জানাননি। এরকম অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থ নেয়া হবে।
ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থার মধ্যে সব ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ ছিল। ফলে সঞ্চিত অর্থ থেকে দিনযাপন করার এক পর্যায়ে সেটিও ফুরিয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে তাদের অনেকে ব্যবসায়ের মূলধন থেকে দিনাতিপাত করেছেন। এদিকে সবে অচলাবস্থা শিথিলের পর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তারপরও ব্যবসার চাকা এখনও পরিপূর্ণরূপে সচল হয়নি।
তাদের দাবি, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় ব্যবসার অবস্থা ভালো না। আবার অনেকে এখনও নতুন করে ব্যবসা চালুও করতে পারেনি। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে এখনই ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব না।
জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার যশোর শহরের রায়পাড়ায় ঋণের কিস্তি আদায়ে আসেন শক্তি ফাউন্ডেশনের কর্মীরা। এদিন গ্রাহকরা কিস্তি দিতে অপারগতা জানালে পরের সপ্তাহ থেকে পরিশোধের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়। শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ নিয়েছিলেন হেলেনা পারভীন নামে এক নারী। তিনি জানান, করোনার মধ্যে সব কিছু বন্ধ থাকায় সবারই এখন অর্থনেতিক অবস্থা খারাপ। এরপর আম্পান ঘূর্ণি ঝড়ে বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে। সেসব মেরামত করতে গিয়ে হাত শূন্য। সবে অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ও ঠিকমতন চালু হয়নি। এমন পরিস্থিতি পরের সপ্তাহ থেকে বাধ্যতামূলক কিস্তি দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
শক্তি ফাউন্ডেশন যশোর শহরের মাইকপট্টি চৌষট্টি নম্বর শাখার ব্যবস্থাপক সাধন কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, ঋণের কিস্তির জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের কোন তাগাদা দেওয়া কিংবা কোন ধরণের চাপ দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে শহর এলাকার বাইরেও অনেক জায়গায় এনজিওর ঋণ আদায়ের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। খবর পাওয়া গেছে, সদরের মনোহরপুর এলাকায় আদ্ব-দ্বীন, হাশিমপুরে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, চুড়ামনকাটিতে বন্ধু কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামক এনজিও গ্রাহকদের ঋণের কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। এমনকি বন্ধু কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামের এনজিওটি থেকে গতকাল ঋণের কিস্তিও আদায় করা হয়েছে।
সদরের এনায়েতপুর থেকে হাসি খাতুন জানান, গতকাল তাকে ফোন করে আদ্ব-দ্বীন এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া বাঁচতে শেখার হুদারাজাপুর শাখা থেকেও ওই এলাকার গ্রাহকদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য ফোন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকের যশোর, খাজুরা ও বাঘারপাড়া শাখা অফিস থেকেও ঋণের কিস্তির জন্য গ্রাহকদের ফোন করে তাগাদা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটির পর ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখনও পুরোদমে সচল হয়নি। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থায় দেশের এনজিওগুলোকে আগামী জুন পর্যন্ত ঋণের কিস্তি না নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জুনের পর ওই কিস্তির উপর নতুন কোনো জরিমানাও না নিতে বলা হয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি থেকে এমন নির্দেশ জারি করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমআরএ’র থেকে বলা হয়েছে, আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণ গ্রহীতা কিস্তি না দিলে তাকে চাপ দেওয়া যাবে না। সেইসঙ্গে নির্ধারিত সময় শেষে কোনো রকমের জরিমানা ছাড়াই বকেয়া কিস্তি গ্রহণ করে ঋণ শ্রেণিকরণ করতে হবে।