আল বিদা মাহে রমজান

বিল্লাল বিন কাশেম
২৯ তম রোজার দোয়া : হে আল্লাহ ! আজ আমাকে আপনার রহমত দিয়ে ঢেকে দিন। গুনাহ থেকে মুক্তিসহ আমাকে সাফল্য দান করুন। আমার অন্তরকে মুক্ত করুন অভিযোগ ও সন্দেহের কালিমা থেকে। হে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি দয়াবান।
আজ শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ। করোনা ভাইরাস এর কারণে এবার রমজানে সারা মুসলিম বিশ্বেই ছিলো কিছু বিধি নিষেধ। তাই ঈদের দিনেও থাকবে কিছু সতর্কতা। স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে সৌদিতেও রয়েছে কারফিউ। এ সময় জমায়েত না হওয়াটাই উত্তম। এবারে ঈদের কেনাকাটাতেও সংযম করেন অনেকে। অন্যান্যবার রমজানের শুরু থেকেই ঈদের প্রস্তুতিতে চলে কেনাকাটার ধুম। এবার এমনিতে বড় মার্কেট বন্ধ রয়েছে। যদিও স্বল্প পরিসরে এসব মার্কেট খোলা ছিলো তাতেও বিচরণ কিংবা যাওয়া আসায় ব্যাপক সচেতনতা অবলম্বন করেছেন। স্বাস্থ্য বিধিনিষেধ মেনে মসজিদে ইতেকাফ করেছেন অনেকে। তবে আমাদের নারী বা মায়েরা একাকি সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইতেকাফ করতে পারছেন আশা করি। সর্বোপরি রমজান শেষে ঈদ উদযাপনেও থাকবে সীমাবদ্ধতা। ব্যাপক ও বড় আয়োজনে ঈদে নামাজেও থাকবে কড়াকড়ি। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা ইসতেগফার করতে হবে। মহামারি করোনা থেকে মুক্তির জন্য বিশ্ববাসীর জন্য তথা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই দোয়া করা আবশ্যক।
এবারে আমরা রমজানের শেষ দশ দিন নিয়ে আলোচনা করবো। রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘রমজান মাসের শেষ দশক শুরু হলেই নবী করিম (সা.) তাঁর কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন। এ সময়ের রাতগুলোতে তিনি জাগ্রত থাকতেন এবং ঘরের লোকদের সজাগ করতেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাসূল (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগির কাজে এতই কষ্ট স্বীকার করেছেন, যা অন্য সময় করতেন না।’ আর হজরত জয়নব বিনতে সালমা (রা.) বলেন, ‘রমজান মাসের শেষ দশকে তাঁর ঘরের লোকদের মধ্যে রাত জেগে ইবাদত করতে পারে এমন কাউকেও ঘুমাতে দিতেন না এবং সবাইকে জেগে থেকে ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত করতেন।’
এ দশকের কিছু বিশেষ আমল রয়েছে। যেমন ইতেকাফ, শবে কদর। এ দশকজুড়েই শবে কদরের অনুসন্ধান করে মুসলিম উম্মাহ। তাই এ দশকের মর্যাদা একটু ভিন্ন। এক হাজার মাস ৮৩ বছরের চেয়েও বেশি হয়। এ রাতের কারণেই পুরো রমজান তাৎপর্য ও ফজিলতপূর্ণ হয়েছে। আর পবিত্র কোরআনও অবতীর্ণ হয়েছে শেষ দশকের কদরের রাতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তো এই কিতাবকে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে। অবশ্যই আমি সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।’ (সূরা : আদ-দুখান, আয়াত : ৩-৪)
এ দশকের বিশেষ আরো একটি আমল হলো, ইতেকাফ। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ইতিকাফ করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও করেছেন, তাই আমাদের জন্যও ইতিকাফ করা সুন্নাত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন : ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি : ১৮৬৮; মুসলিম : ২০০৬)
হজরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, ‘রাসূল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান।’ (বুখারি : ১৯০৩) রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে, সে যেন ইতিকাফে বসে।’ (মুসলিম : ১৯৯৪)
এ দশকে ইতেকাফ ও শবে কদর অঙ্গাঙ্গি জড়িত। রমজানের বিদায়ী দশক হিসাবে এ দিনগুলোতে কোনভাবেই হেলায় হেলায় কাটানো উচিত নয়। ইতেকাফ ও শবে কদর দুটিই পবিত্র মাহে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আমল। রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মতোই নাজাতের দশককে আমল, দোয়া দরুদ ও মুক্তি প্রার্থনার মাঝ দিয়ে কাটানো উচিত। ঈদ উৎসবের নামে যেন এ দশকের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো কোনভাবেই হারিয়ে না যায়।
আগামীকাল থেকে পত্রিকা বন্ধ থাকবে সে কারণে একই সাথে ৩০ তম রোজার দোয়াটিও দেয়া হলো;
হে আল্লাহ ! আপনি ও আপনার রাসুল ঠিক যেমনিভাবে খুশি হবেন তেমনি করে আমার রোজাকে পুরস্কৃত করুন এবং কবুল করে নিন। আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পবিত্র বংশধরদের উসিলায় আমার সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলকে মূল এবাদতের সাথে যোগ করে শক্তিশালী করুন। আর সব প্রশংসা ও স্তুতি জগতসমূহের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর।
আল্লাহ বিশ্ববাসীকে প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি দান করুন। রমজানের রহমত বরকত মাগফেরাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের নাজাত লাভের তাওফিক এনায়েত করুন। আমিন।
লেখক : উপ-পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

শেয়ার