সুপার সাইক্লোন আম্পানে যশোর ধ্বংসস্তুপ

 বিভিন্ন উপজেলায় ৬ জনের মৃত্যু
 ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫শ’ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত
 ১ শ’ ১৫ একর সবজি ক্ষেতের সর্বনাশ

সালমান হাসান রাজিব ও জাহিদ হাসান
সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবে পুরো যশোর এখন জেরবার দশায়। জীবাণু শত্রু কোভিড-১৯’র লাগাতার ‘হামলার’ মধ্যেই অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় হানা দিল। যার কয়েক ঘণ্টার ভয়াল আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ঘরবাড়ি, গাছপালা, সবজির ক্ষেত ও ফলের বাগান। এমনকি ঝড়ের সময় ভেঙে পড়া গাছের চাপায় প্রাণ হারিয়েছে ছয় জন। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। ঝড়ের তা-বে জেলায় দেড় লক্ষাধিক ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সাথে ১ শ’ ১৫ একর সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। বাজারে তোলার মতন আম ও লিচুর বেশির ভাগই ঝরে পড়েছে।
দানবীয় ঘূর্ণি ঝড়ের দাপটে অসংখ্য ছোট বড় গাছ উপড়ে ও ডালপালা ভেঙে পড়ে অনেক জায়গার যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়। খুঁটি ভেঙে ও লাইনের তার ছিঁড়ে বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা বারোটার দিকে বিদ্যুত ব্যবস্থা ফের সচল হয়। এরপরও ভাঙা খুঁটি ও লাইনের মেরামত শেষ না হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকে।

এছাড়া ঝড়ে যশোর বেনাপোল সড়কের শতবর্ষী ৫টি গাছ সড়কের উপরে উপড়ে পড়ে। এতে বৃহস্পতিবার এই সড়কে বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক ও জরুরি যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
বুধবার রাতেই ঝড় শুরুর পরপরই বাতাসের তোড়ে যশোর শহরের বিভিন্ন সড়কে থাকা তোরণগুলো ভেঙে পড়ে। টিনের চালা থেকে খুলে আসা টিন রাস্তায় আছড়ে পড়তে থাকে। ভেঙে পড়া গাছ ও ডালপালায় রাতেই শহরের অনেক জায়গার বিদ্যুতের লাইনের তার ছিড়ে যায়। ছিড়ে পড়া তার রাস্তায় পড়ে থাকতে ও খাম্বা থেকে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। ভোরের দিকে ঝড়ে তান্ডব কমতে শুরু করে। দিনের আলো ফুটলে ঝড় থেমে গেলে বাতাস বইতে থাকে। এই সময় মানুষজন ঘর থেকে বেরিয়ে ঝড়ের তান্ডবে ভেঙে পড়া গাছ, বিধ্বস্থ ঘরবাড়ি ও রাস্তায় উড়ে আসা টিনের স্তুপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। সকালের দিকটায় ঝড়ের তান্ডবের আসল দৃশ্য দেখা যায়।

ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া পৌরপার্ক দেখে ঝড়ের দাপট ও ক্ষমতা বোঝা যায়। পার্কের ওয়ার্কিং ওয়ের পাশ দিয়ে থাকা অনেক সংখ্যক উপড়ে পড়া গাছ নজরে পড়ে। পার্কভর্তি ওপড়ানো গাছ ও ডালপালা। ঝড়ে পার্কের ভেতর থাকা সাংস্কৃতিক সংগঠন তির্যকের কার্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শহরের ষষ্ঠতলার বুনোপাড়া এলাকায় পরিবহন শ্রমিক নেতা মিন্টুর বাড়িতে বিরাট আকারের একটি রেইনট্রি গাছ ভেঙে পড়ে। গাছের চাপায় কারোর প্রাণহাণি না হলেও ইট-টিনশেডের চার কামরার বাড়িটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ঝড়ের রাতে শহরের লোন অফিস পাড়ার আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের টিনশেডের সবকটি ক্লাসরুমের চালা উড়ে গেছে। এছাড়া করবালা মসজিদ, খড়কি গাজির বাজার ও চাঁচড়া মোড়ে জেলা পরিষদের বেশ অনেকগুলো দোকানের চালা ঝড়ে উড়ে যায়। মণিহার সিনেমা হল এলাকায় একটি বিলবোর্ড ভেঙে বাসের উপর পড়ে বাসটি দুমড়ে যায়।
খড়কি আপন মোড় এলাকায় একটি বাড়ির টিনের চালে রেইনট্রি গাছ ভেঙে আছড়ে পড়ে। কিন্তু এতে কারোর কোন ধরণের ক্ষতি হয়নি। ডিসির বাসভবনের ভেতরে গাছের ভেঙে পড়া ডালপালায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এসপি অফিস সড়কে ক্যাথলিক গির্জার সামনে একটি দেবদারু গাছ ভেঙে বৈদ্যুতিক লাইনের তারের উপর পড়ে। হাসাপাতাল চত্বরের ছোট বড় পাঁচ ছয়টি গাছ ভেঙে পড়ে। দুদক যশোর জেলা সম্বনিত কার্যালয়ে একটি রেইনট্রি গাছ ভেঙে সীমানা প্রাচীর ভেঙে যায়।

এদিকে শহরের রেলগেট এলাকার বেশ অনেকগুলো বাড়ির টিনের চালা উড়ে গিয়ে ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হেলেনা পারভীন জানান, তার বাড়িতে ছয়টি টিন শেডের ঘর ভাড়া দেওয়া আছে। ঝড়ের তা-বে সেগুলোর সবকটির চালা উড়ে গেছে। রাতে এসব ঘরের ভাড়াটিয়ারা তার বাসায় আশ্রয় নেন। সকালে উড়ে যাওয় টিনের চালা গুলো অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, আম্পানের আঘাতে যশোরের আট উপজেলায় ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫শ’ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ শ’ ১৫ একর সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। দুই হাজার ৮৫০ টি গৃহপালিত প্রাণী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে গাছ উপড়ে পড়ে ৬ জন মারা গেছে ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
জানা গেছে, শার্শায় পৃথক ঘটনায় তিনজন এবং বাঘারপাড়ায় একজন নিহত হয়েছেন। চৌগাছায় গাছচাপা পড়ে মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলেন, চৌগাছা পৌরসভার হুদো চৌগাছা এলাকার ওয়াজেদ হোসেনের স্ত্রী চায়না বেগম (৪৫) ও মেয়ে রাবেয়া খাতুন (১৩)। ঝড়ে ঘরের ওপরে গাছ ভেঙ্গে পড়লে এ দু’জন নিহত হন। আহত হন চায়না বেগমের ছেলে আলামিন (২২)।

এদিকে বাঘারপাড়ার উপজেলার দরাজহাট এলাকার ডলি বেগম (৪৫), শার্শা উপজেলার ময়না খাতুন (৪০), জামতলা এলাকার মুক্তার আলী (৬৫) ও একই এলাকার গোপাল চন্দ্র (৫০) মৃত্যুবরণ করেছে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে গাছচাপা পড়ে জেলায় ৬জন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সবজি, আম ও লিচুর ক্ষতি হয়েছে। তবে বোরো ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে বিধায় ধানের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। গৃহ বা ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য কাজ চলছে।
ঝড়ে মৃত্যুর শিকার প্রতিটি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুতই ত্রাণ ও বসতবাড়ি পুনঃনির্মানের ব্যবস্থা করা হবে বলে অরো যোগ করেন তিনি।

অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান’র প্রভাবে বুধবার সারাদিন থেমে থেমে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। রাত ৮টার পর থেকে বাড়তে থাকে ঝড়ের গতিবেগ। যশোরে সর্বোচ্চ ১৩৫ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হওয়ার খবর দিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার মধ্যরাত ১২টার পর যশোরের ওপর দিয়ে সর্বোচ্চ ১৩৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে গেছে। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় এই ঝড়ো হওয়া। রাত ৮টার পর থেকে ঝড়ের গতিবেগ ১শ’ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। রাত দু’টার পর থেকে কমতে থাকে ঝড়ের গতিবেগ। ঝড়ের সঙ্গে ছিল ভারী বৃষ্টিপাতও। বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত এই জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১২১ মিলিমিটার।
এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবারও যশোরের আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। থেমে থেমে এদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও হয়। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এদিন মানুষজনকে ভেঙে পড়া ও চালা উড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ঠিক করতে দেখা যায়।

শেয়ার