মাহে রমজান

বিল্লাল বিন কাশেম
১৭ তম রোজার দোয়া : হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে সৎকাজের দিকে পরিচালিত করুন। হে মহান সত্ত্বা যার কাছে প্রয়োজনের কথা বলার ও ব্যাখ্যা দেয়ার দরকার হয় না । আমার সব প্রয়োজন ও আশা-আকাঙ্খা পূরণ করে দিন। হে তাবত দুনিয়ার রহস্যজ্ঞানী! হযরত মুহাম্মদ (স/) এবং তাঁর পবিত্র বংশধরদের ওপর রহমত বষর্ণ করুন।
আজ ১৭ রমজান। আজ আমরা ওশর ও খিরাজ সম্পর্কে আলোচনা করবো। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় বলা হয়ে থাকে যাকাত ব্যবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে সমাজে দারিদ্র্য থাকবে না। সম্পদের যাকাত আদায় করা ফরজ। অন্যান্য সম্পদের ন্যায় ভূমি থেকে উৎপাদিত ফসলের ও নির্ধারিত যাকাত রয়েছে। এটা আদায় করা ফরজ। শরীয়তের পরিভাষায়-ফসলের যাকাতকে ‘উশর’ বা ‘খিরাজ’ বলে। অর্থাৎ জমি উশরী হলে যা আদায় করতে হবে তা ‘উশর’। আর জমি খিরাজী হসলে যা আদায় করতে হবে তা ‘খিরাজ’। মুসলমানের মালিকাধীন ভূমিই হচ্ছে উশরী ভূমি। ‘উশর’ এর অভিধানিক অর্থ হচ্ছে-একদশমাংশ। মুসলমানের মালিকানাধীন ভূমি থেকে উৎপাদিত ফসলের একদশমাংশ বা দশ ভাগের এক ভাগ অথবা একদশমাংশের অর্ধেক তথা বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দেয়াকে ‘উশর’ বলে। অর্থাৎ মুসলমানের মালিকানাধীন যেসব জমিকে বৃষ্টির পানি এবং নদীর পানি সিক্ত করে কিংবা স্বভাবতই সিক্ত থাকে-এমন জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। যেসব জমিকে সেচের মাধ্যমে সিক্ত করা হয়-এমন জমি উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। অন্যান্য সম্পদের যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর মালিকানাধীন থাকা শর্ত কিন্তু ফসলের যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সেই ফসল এক বছর মালিকানাধীন থাকা শর্ত নয়। বরং যখনই ফসল হস্তগত হবে তখনই উশর আদায় করতে হবে। এমনকি বছরে যতবার ফসল উৎপাদন হবে ততবারই ফসলের দশভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।
ফসলের যাকাত আদায় করা ফরজ। এ বিষয়টি পবিত্র কোরআন দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। এরশাদ হচ্ছে- ‘তার ফসল উৎপাদিত হলে তা তোমরা খাও এবং ফসল কাটার দিনই তার হক আদায় কর’ (সূরা আনআম : আয়াত-১৪১)। ফসলের যাকাত হচ্ছে ‘উশর’। অন্য আয়াতে এরশাদ হচ্ছে- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি থেকে তোমাদের জন্য বের করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর’ (সূরা বাকারা : আয়াত-২৬৭)। ‘উশর’ এর যাকাত সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন-‘যে জমিকে বৃষ্টির পানি অথবা নদীর পানি সিক্ত করে অথবা স্বভাবতই সিক্ত হয় তাতে ‘উশর’ অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। আর যে জমিকে সেচের মাধ্যমে সিক্ত করা হয় তাতে ‘অর্ধ উশর’ অর্থাৎ বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে (বুখারী-১ম খ- : পৃষ্ঠা-২০১, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১৫৯)। যে জমিতে পরিশ্রম করে পানি সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করা হয়-সেসব জমির উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ (বিশ মন হলে এক মন) উশর হিসেবে দিতে হবে।
উশর এর নিসাব বা পরিমাণ বা উশর আদায় নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে-উশর এর নির্ধারিত কোন নিসাব নেই। যে পরিমাণ ফসলই উৎপাদন হোক না কেন উশর (দশ ভাগের এক ভাগ) আদায় করতে হবে। হানাফী ফিকহের কিতাবাদীতে উশর এর নিসাবের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার মতের পক্ষে ফতোয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ (র.) ও ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর মতে-উশর এর নিসাবের পরিমাণ পাঁচ ওসাক (প্রচলিত মাপে ৯৪৮ কেজি)। অর্থাৎ ফসলের পরিমাণ ৯৪৮ কেজি হলে উশর (দশ ভাগের এক ভাগ) আদায় করতে হবে-এর কম হলে উশর আদায় করতে হবে না। কোন কোন কিতাবে মুতাআখখিরীনদের মতে-ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর মতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। উশরী ভূমিতে উৎপাদিত ধান, গম ইত্যাদির মত ফলমূল, শাক-সবজিরও উশর দিতে হবে। প্রাপ্ত ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ বা এর বাজার মূল্য দিয়েও উশর আদায় করতে পারবে। বর্গা চাষের ক্ষেত্রে জমির মালিক এবং চাষী প্রাপ্ত ফসলের নিজ নিজ অংশের উশর আদায় করতে হবে। তাই যাকাতে উশর বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা আমাদের সকলের উচিত। আল্লাহ আমাদের ওশর ও খারাজ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমল করার তৌফিক এনায়েত করুন।

লেখক : উপ-পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।[email protected]

শেয়ার