ভয়াল স্মৃতিবহ কালরাত আজ

 সেই অপারেশন সার্চলাইট: পুরো প্রজন্ম নিশ্চিহ্নের চক্রান্ত

সমাজের কথা ডেস্ক॥ অপারেশন সার্চলাইট- বাঙালীদের কমপক্ষে এক প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার এক নারকীয় পরিকল্পনার নাম। চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতার প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন পশ্চিম পাকিস্তানে পাকি সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে এই অপারেশনের প্রস্তাব করা হয়। আর মার্চের ১৭ তারিখে জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে আরেক জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে এই ভয়াবহ অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব দেয়। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা ও কুখ্যাত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লেখেন বলে বিভিন্ন গবেষণা দলিলে উঠে এসেছে।
মূলত রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানকারী বাঙালীদের একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয় অপারেশন সার্চলাইটে। ওই পরিকল্পনার ছয়টি লক্ষ্য ছিল। ১. সারা পূর্ব পাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করতে হবে। ২. সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করতে হবে। ৩. ঢাকায় অপারেশন ১০০ ভাগ সফল হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল এবং তল্লাশি করতে হবে। ৪. সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে যতো অস্ত্র দরকার ব্যবহার করা হবে। ৫. টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফসহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং ৬. অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে সকল পূর্ব পাকিস্তানী (বাঙালী) সৈন্যদলকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে।
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার দল আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তাদের স্বপ্ন ছিল অত্যাচারী পাকিস্তানী সেনাশাসনের বদলে এদেশে আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী মনে করে, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া মানে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। তাই যে কোন মূল্যে পূর্ব পাকিস্তানকে দখলে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়ার বদলে তাদের হত্যা করার নীল নক্সাই চূড়ান্ত করে।
বাঙালীদের হত্যার এই নীল নক্সার প্রমাণ পাওয়া যায় পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজির ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে। নিয়াজি তার পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তার বাইতে উল্লেখ করেছেন টিক্কা তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি মাটি চাই, মানুষ চাই না।’
পাকিস্তানী শাসকচক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোও। তবে এই ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। তিনি বুঝতে পারছিলেন, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কোনভাবেই বাঙালীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাইতো বিষয়টি তিনি বাঙালী জাতির কাছে স্পষ্ট করার জন্য ২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। জনাকীর্ণ ওই সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জনসাধারণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রক্রিয়া বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র ও জানগণকে আমাদের বিজয় বানচালের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হতে হবে।’ তিনি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ‘জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচালের উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে কৃত্তিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কাই সত্যি হলো। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আকস্মিক এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। অধিবেশন স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকায় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা বিমানবন্দর এবং পিআইএর মতিঝিল অফিসের কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস ছেড়ে চলে যান। ফলে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্রদেশের বিভিন্ন রুটে এবং আন্তঃদেশীয় রুটে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেতারে ইয়াহিয়ার বিবৃতি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাঙালী জাতি অপেক্ষা করতে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের কী নির্দেশ দেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভুট্টো এবং জেনারেলদের মধ্যকার ঐকমত্যের বিষয়টি সামনে এলো।

শেয়ার