করোনাভাইরাসে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ২৭
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত, বন্ধ বিপণি বিতান

১২ পণ্য’র আমদানি শুল্ক অব্যাহতি, বিদ্যুৎ বিলের জরিমানা মওকুফ
চিকিৎসক-নার্সদের সুরক্ষা উপকরণ দেওয়ার নির্দেশ হাই কোর্টের
আক্রান্ত সন্দেহে সিলেটে মারা যাওয়া নারীর নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ বাংলাদেশে আরও তিনজনের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ নিয়ে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৭এ। এরই মধ্যে সিলেটে লন্ডনফেরত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে সন্দেহ হওয়ায় তার নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর করোনাভাইরাস থেকে চিকিৎসক-নার্সদের সুরক্ষার জন্য উপকরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
এদিকে, নভেল করোনাভাইরাস ছড়াতে থাকায় ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে সরকার। পাশাপাশি সরকার চিকিৎসাসংক্রান্ত ১২টি পণ্য আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে এবং ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের জরিমানা মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর বিপণি বিতানগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।

বাংলাদেশে আরও তিনজনের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে; যাদের মধ্যে দুজন সম্প্রতি বিদেশ থেকে ফিরেছেন এবং একজন পুরনো এক রোগীর সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা রোববার এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, এ নিয়ে বাংলাদেশে মোট ২৭ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ল, যাদের মধ্যে মোট পাঁচজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কারও মৃত্যু হয়নি; মোট মৃতের সংখ্যা দুই জনই আছে।
অবশ্য সিলেটে এক লন্ডনফেরত নারী এবং খুলনায় আরও দুজনের মৃত্যুর খবর এসেছে, যারা করোনাভাইরাসের মত উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি চিকিৎসকরা।
অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে দুজন পুরুষ, একজন নারী। তাদের বয়স বিশ থেকে চল্লিশের ঘরে। “তাদের একজনের কোমর্বিডিটি রয়েছে। তার ডায়াবেটিস ও হাঁপানি আছে। কিন্তু তিনজনের ক্ষেত্রেই লক্ষণ মৃদু। তারা ভালো আছেন।”
বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে তিনজন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানিয়েছিল আইইডিসিআর। তারা তিনজনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
পরে আক্রান্তদের মধ্যে নতুন যে দুজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তারাও রোববার বাসায় ফিরবেন বলে জানান আইইডিসিআর পরিচালক।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সংক্রমিতদের মধ্যে ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর করোনাভাইরাসের লক্ষণ আছে এমন ৪০ জনকে রাখা হয়েছে আইসোলেশনে।
“হাসপাতালে যারা আছে, তাদের মধ্যে একজনের কিডনির সমস্যা রয়েছে, তার ডায়ালাইসিস লাগে। তার অবস্থা সেরকমই আছে। বাকি যারা রয়েছেন তাদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক।” আইইডিসিআরে এ পর্যন্ত মোট ৬৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে; এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছে ৬৫ জনের নমুনা।
অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, “সিলেটে একজন কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখনও ফলাফল আসেনি।”
কারও ক্ষেত্রে সন্দেহ করলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে সব প্রটোকল মেনেই তাদের সৎকার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মীরপুরে যে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে, তিনি কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শিকার কি না- সেই প্রশ্নে মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ বলার আগে তারা আরেকটু সময় নিতে চান।
“তাদের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। মিরপুরে যে ব্যক্তি মারা গিয়েছে ওই এলাকায় দুজন বিদেশ ফেরতের সন্ধান পেয়েছি। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা দেখতে চাই তাদের মধ্যে কোনো সংক্রমণ ছিল কি না, তার কাছ থেকে এসেছে কি না।”
তিনি বলেন, “আরেকজনের ব্যাপারেও (সিলেট) আইইডিসিআর ব্যাপকভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। অন্যদের ক্ষেত্রে লক্ষণ উপসর্গ হওয়ার চারদিন আগে থেকে কন্টাক্ট ট্রেসিং করলেও তাদের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে, বাংলাদেশেও প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস ছড়াতে থাকায় ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে সরকার।
এপ্রিলের প্রথম দিকে পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এইচএসসির উত্তরপত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত করে সকালেই নোটিস জারি করে সবগুলো শিক্ষা বোর্ড। পরীক্ষা নেওয়ার অত্যবশকীয় এসব সরঞ্জাম ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত বিতরণের কথা ছিল।
তার আগে গত শনিবার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র বিতরণ কার্যক্রম আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
আগামী ১ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত এইচএসসির তত্ত্বীয় এবং ৫ থেকে ১৩ মের মধ্যে সব ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ করার সূচি নির্ধারিত ছিল।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সংগ্রহ এবং সরবরাহ করতে সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে রোববার বিচারপতি আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্টের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। পরে তিনি বলেন, “মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কী কী উপকরণ দরকার তা নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করতে বলেছে আদালত।
নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে মানুষের বাইরে যাওয়া কমে যাওয়ায় বিপণি বিতানগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। ২৫ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে নিত্যপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বিপনি বিতানগুলো বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন। রোববার মালিক সমিতির নেতারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেয়।
দেশে নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে গ্রাহকদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল তিন থেকে চার মাস দেরিতে দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ।
রোববার দুই বিভাগের আলাদা চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের বিদ্যুৎ বিল বিলম্ব ফি ছাড়াই পরে জমা দেওয়া যাবে।
আর গ্যাসের আবাসিক গ্রাহকরা কোনো ধরনের বিলম্ব ফি ছাড়াই ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের বিল জুন মাসের সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করতে পারবেন।
নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকানো কিংবা রোগ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়, এমন ১২টি উপকরণ আমদানি আপাতত শুল্কমুক্ত করে দিয়েছে সরকার। এসব পণ্য আমদানিতে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
তবে এই আমদানির ক্ষেত্রে দুটি শর্ত থাকছে; তা হল- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য আমদানি করা যাবে, আমদানি করা পণ্য মানসম্মত কি না, তা অধিদপ্তর কর্তৃক নিশ্চিত করতে হবে।
পণ্যগুলো হলো- ইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল, কভিড-১৯ টেস্ট কিটস বেইজড অন ইম্যুনোলজিক্যাল রিঅ্যাকশন, কভিড-১৯ টেস্ট কিটস (পিসিআর টেস্ট), কভিড-১৯ ডায়ানস্টিক টেস্ট যন্ত্র, বড় পরিমাণে জীবাণুনাশক, থ্রি-প্লাই বা থ্রি লেয়ার সার্জিকাল মাস্ক, প্লাস্টিকের তৈরি সুরক্ষা পোশাক, প্লাস্টিকের ফেইস শিল্ড, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা পোশাক, ফুল বডি ওভেন স্যুট, মেডিকেল প্রটেকটিভ গিয়ার এবং সুরক্ষা চশমা ও গগলস।

শেয়ার