কোন মেজরের বাঁশির ফুঁতে দেশ স্বাধীন হয়নি : শেখ হাসিনা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ পঁচাত্তরের পর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে যারা এই সংগ্রামের নেতার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে, তাদের লাজ-লজ্জা আছে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঐতিহাসিক সাতই মার্চ উপলক্ষে শনিবার বিকালে এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশে ইতিহাস বিকৃতির যে প্রবণতা চলেছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।
স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম-অবদান সব জায়গা থেকে মুছে ফেলার তৎপরতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “এই বাংলাদেশে এমন একটা সময় ছিল, বাংলা ভাষার দাবিতে তার যে আন্দোলন সেটা মুছে ফেলা হয়েছিল। নাই-একেবারে অস্বীকার করে ফেলা হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিসংগ্রামে তার যে অবদান, সেটাও মুছে ফেলা হয়েছিল।
“এমনভাবে বিকৃত ইতিহাস তৈরি করা হল, কোনো এক মেজর বাঁশির ফুঁ দিল, আর অমনি যুদ্ধ হয়ে গেল, দেশ স্বাধীন হয়ে গেল! এ রকম বিকৃত ইতিহাস! অথচ সে নিজেই চাকরি করত বাংলাদেশ সরকারের অধীনে, চারশ টাকা বেতন পেত। তাকেই বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, ঘোষক হিসেবে। ইতিহাস বিকৃতির কোন পর্যায়ে, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।”
ক্ষোভ-হতাশার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “আমি জানি না, যারা এই ভাষণ মুছে ফেলতে চেষ্টা করেছিল, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করেছিল, তারা লজ্জা পায় কি না। অবশ্য তাদের লাজ-লজ্জা আছে বলে মনে হয় না। তারা যদি নির্লজ্জই না হবে তাহলে তার (বঙ্গবন্ধু) ভাষণ, তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করে কেউ?”
পঁচাত্তরের পর জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ থাকায় তখনকার প্রজন্ম সাতই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য সেভাবে ‘বুঝতে পারেননি’ বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “সব থেকে বড় কথা, পঁচাত্তরের পর এ ভাষণ নিষিদ্ধ ছিল। ভাবলে দুঃখ হয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মৃযে বয়সে এই ভাষণটা শুনলে তাদের ভেতরে দেশপ্রেম জাগ্রত হত, সে ভাষণটি অনুপ্রেরণা দিত- এই ভাষণের তাৎপর্য অনেকে জানতেই পারেনি, বুঝতে পারেনি। ”

সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে যেসব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিজেদের এলাকায় বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ প্রচার করতেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “জাতির পিতার আদর্শের সৈনিকদের কাছে কোনো বাধা বাধা ছিল না। সব বাধা অতিক্রম করে তারা ভাষণ বাজিয়েছেন সমস্ত জায়গায়। যারা সেই ভাষণ শুনেছে, তারাই বুঝেছে, কী অমূল্য সম্পদ তারা হারিয়েছিল।”

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ যুগ যুগ ধরে সারা বিশ্বের মানুষকে উজ্জ্বীবিত করবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, সাতই মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়ে এই দেশের মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এই ভাষণ সারা বিশ্বে একমাত্র ভাষণ। আমি বহু মানুষকে বার বার জিজ্ঞাসা করেছি কতবার আর কত ঘণ্টা কত দিন কত সময়
কত মানুষ এই ভাষণ শুনেছে, কেউ কি হিসাব করতে পারবে? পারবে না।
“আজকে ৪৯ বছর ধরে একটা ভাষণ তার আবেদন রাখতে পারে। সারা পৃথিবীতে সাতই মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণই একমাত্র ভাষণ, যেটা এখনও আবেদন রেখে যাচ্ছে। এ ভাষণ যুগ যুগ ধরে এ দেশের মানুষকে শুধু না, সারা বিশ্বের মানুষকে উজ্জীবিত করবে।”

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে, কাজেই বাঙালি আজকে একটা সম্মান পাচ্ছে। এটা যে শুধুমাত্র আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য তা শুধু নয়। এটা জাতির পিতার ভূমিকা যে ছিল মুক্তির সংগ্রামে, স্বাধীনতার সংগ্রামে আজকে সেটা যখন প্রকাশ হচ্ছে, প্রচার হচ্ছে, মানুষের কাছে যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ না, অন্য দেশের মানুষকে প্রেরণা যোগায়, শক্তি যোগায়, সাহস যোগায় যুগ যুগ ধরে।”

সাতই মার্চের ভাষণের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যত ভাষণ সামরিক- অসামরিক নেতারা দিয়েছেন, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ সাতই মার্চের ভাষণ। এই ভাষণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে স্বাধীনতার চেতনায়।”

মুক্তিযুদ্ধের সাতই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “টানা নয় মাস স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে ভাষণের বিভিন্ন অংশ বাজানো হত। জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন, এ ভাষণে তারা প্রেরণা পেতেন, শক্তি পেতেন।”

শেয়ার