চার লেনে উন্নীতের কাজ শুরু ॥ মনিহার-মুড়লি মহাসড়কের আড়াইশ’ স্থাপনা উচ্ছেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সড়ক ও জনপথ বিভাগের জোরদার অভিযানে ভাঙা পড়ল যশোর শহরের মনিহার-মুড়লি মহাসড়কের আড়াইশ’ অবৈধ স্থাপনা। স্কেভেটর ও পেলোডার চালিয়ে মহাসড়কের জায়গায় নির্মিত এসব স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়। বুধবার দিনভর মহাসড়কটির দুই পাশে স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে দোকান-পাট, টিন শেডের আধা-পাকা স্থাপনসহ বহুতল ভবনের আংশিক ভাঙা পড়ে। পাশাপাশি সীমানা প্রাচীর ও গাড়ির বডি তৈরির ওয়ার্কশপ উচ্ছেদ করা হয়।
এদিকে অভিযান চলাকালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-৬) ভাড়া করা অফিসের অবৈধ প্রাচীর উচ্ছেদ করতে গেলে বাধার সৃষ্টি করা হয়। র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে এসময় সওজ’র (সড়ক ও জনপথ বিভাগ) স্টেট ও আইন কর্মকর্তা অনিন্দিতা রায়ের সাথে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া র‌্যাব অফিসের প্রাচীর ভাঙায় সওজ’র একজন উপসহকারী প্রকৌশলীসহ দু’জন ড্রাইভারকে মারপিট করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সওজ যশোরের উপসহকারী প্রকৌশলী তরুন কুমার দত্তসহ এস্কেভেটরের ড্রাইভার অমৃত ও প্রতাপকে মারপিট করেছেন র‌্যাব সদস্যরা।


সওজ’র স্টেট ও আইন কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী সচিব) অনিন্দিতা রায় সাংবাদিকদের বলেন, র‌্যাব সুশৃংখল বাহিনী। তাদের কাছে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। কয়েকজন র‌্যাব সদস্য আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। তারা বলছেন, অবৈধভাবে উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু তাদের দাবি মোটেও সঠিক নয়। কারণ ভাড়া বাসায় র‌্যাবের অফিস রয়েছে। বাড়ির মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করেছে। সরকারের সিদ্ধান্তে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি। এটাকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্বদানকারী সওজ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অনিনিন্দা রায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার। সেই সাথে বিভাগটির একজন উপসহকারী প্রকৌশলীসহ দুজন ড্রাইভারকে মারপিটের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য র‌্যাব-৬’র অফিসিয়াল ফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও কেউ রিসিভ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের উচ্ছেদ অভিযান থেকে র‌্যাব অফিসের প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব-৬’র অফিস থেকে এমন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে বিভাগটির কোন কর্মকর্তার র‌্যাব সদস্যদের খারাপ ব্যবহার ও কোন প্রকৌশলী এবং ড্রাইভারদের মারপিটের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান তিনি।


সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, মনিহার এলাকার বিসিএমসি কলেজের সামনে থেকে মুড়লি পর্যন্ত ২ দশমিক ৯১ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার লেন নির্মাণ কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে নির্মাণ কাজও খুব দ্রুতই শুরু হচ্ছে। আর মহাসড়কটির এই চার লেন নির্মাণের জন্য উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। গতকাল ছিল অভিযানের প্রথম দিন। আজ বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালানো হবে।
সূত্র মতে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্থাপনা নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে নোটিশ দেওয়া হয়। দোকানপাট, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাসহ সীমানা প্রাচীরে এই নোটিশ সেঁটে দেওয়া হয়। দুইশরও বেশি নোটিশ সাঁটানো হয় বেআইনি এসব স্থাপনা সরানোর জন্য। পাশাপাশি মাইকিং করে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়। মহাসড়ক এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দিন ব্যাপী মাইকিং করা হয়।
অভিযান চলাকালে সরেজমিন বকচর মুড়লি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, স্কেভেটর ও পেলোডার চালিয়ে উচ্ছেদ চলছে। যন্ত্রযান চালিয়ে আধাপাকা টিনশেডের স্থাপনা, বাঁশটিনের চালা, বহুতল ভবনের সামনের অংশ, বাড়ির বারান্দা, শোরুমের সিড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এস্কেভেটর চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয় সওজ’র জায়গায় থাকা সীমানা প্রাচীর। পেলোডার চালিয়ে অটোমোবাইল শপ উচ্ছেদের পাশাপাশি এগুলোর সামনে রাখা বাস-ট্রাক ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া উপড়ে ফেলা হয় মহাসড়কের পাশে থাকা বিভিন্ন ধরণের গাছ। এদিনকার অভিযানে সওজের জায়গায় থাকা র‌্যাব অফিসের সীমানা প্রাচীরও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
অভিযান চলাকালে সওজের কর্মরতদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দেন সওজের খুলনা বিভাগের স্টেট এন্ড আইন কর্মকর্তা অনিন্দিতা রায়।
এদিকে শহরের বারান্দিপাড়া থেকে মুড়লি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির মালিকদের নিজ উদ্যোগে অবৈধ স্থাপন সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ টেকনিক্যাল কলেজ, বিসিএমসি কলেজসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
সওজ বিভাগ যশোরের সার্কেল-২’র উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সৈয়দ সফিকুন নবী জানান, মনিহার-মুড়লি মহাসড়কে চার লেনে রূপান্তর কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তাই অচিরেই এটির নির্মাণ কাজও শুরু হতে যাচ্ছে। এজন্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় উচ্ছেদ চালানো হবে।
জানা যায়, চার লেনে উন্নীত হচ্ছে যশোর শহরের পালবাড়ি-দড়াটানা-মনিহার-মুড়লি জাতীয় মহাসড়কের মনিহার এলাকা থেকে মুড়লি অংশ। মহাসড়কটিতে চাল লেনের পাশাপাশি ধীর গতির যান চলাচলের জন্য আরো দুটি লেন নির্মাণ হবে। পাশাপাশি মহাসড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই পাশে ড্রেনও নির্মাণ হবে। আর এই কাজের জন্য ব্যয় করা হবে ১৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে ২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার রাস্তা চার লেনে রূপান্তরিত হবে। বর্তমান প্রশস্ততা বাড়িয়ে ১১৬ ফুটে উন্নীত করা হবে।

শেয়ার