মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা…
মায়ের ভাষার দিন আজ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালবাসা…। মায়ের কোলে, সে তো বলাই বাহুল্য, অপার শান্তি। একইভাবে মাতৃভাষায় কথা বলা পরম তৃপ্তির। সন্তানের এটি জন্মগত অধিকার। কিন্তু বাঙালীকে এ অধিকার আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আদায় করতে হয়েছিল।
আজ শুক্রবার সেই ঐতিহাসিক দিন। পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেয়া অমর একুশে। ১৯৫২ সালের এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল বাঙালী। সইমু না আর সইমু না অন্য কথা কইমু না/যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান/এই জানের বদলে রাখুম রে/বাপ-দাদার জবানের মান…। কী আশ্চর্য বোধ। ভাষা চেতনা। ভাবা যায়! মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে মহা ইতিহাস গড়েছিল বাঙালী। সেই থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিরল মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিবারের মতো আজও সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হচ্ছে মহান শহীদ দিবস। সর্বত্র সকলের কণ্ঠে বাজছে চির বেদনার গান, শোকসঙ্গীত : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…। বায়ান্নর আত্মত্যাগের ইতিহাস ভোলেনি বাঙালী। সে প্রশ্ন আসে না। বরং প্রতিবছর নতুন আবেগ নব চেতনায় জাগ্রত হয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বায়ান্নর ভাষার সংগ্রাম আন্দোলিত করেছে বিশ্ববাসীকেও। বহুকাল আগে যে বাংলাকে নিশ্চিহ্ন করার অযুত চেষ্টা হয়েছিল, আজ তা নিয়ে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের বিপুল আগ্রহ। একুশের ইতিহাস হারাতে বসা মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষায় অনুপ্রাণিত করছে। বাংলা ভাষার মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলা সাহিত্যও। বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখন সারা দুনিয়ার। বিশ্বকবি হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিনিয়ত অনুবাদ হচ্ছে কবিগুরুর রচনা। দূর-দূরান্তের দেশে গবেষণা হচ্ছে তাকে নিয়ে। তেমনি বাংলা ও বাঙালীর মহান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। জ্যোতি ছড়াচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও আগে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বিস্মৃত সে ইতিহাসও সামনে আসছে এখন। পাওয়া যাচ্ছে দুর্লভ দলিল দস্তাবেজ। ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি সারা বিশ্বে বাংলারই প্রতিনিধিত্ব করছেন। পৃথিবীর রাজনীতি, জাতিরাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস আলোচনায় অনিবার্য হয়ে আসছে তার নাম। বাংলা ভাষার আলোচনায় তিনি আসছেন। তেমনি তার আলোচনায় আসছে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের নাম।
এর আগে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয় ভারতবর্ষ। জন্ম নেয় পৃথক দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলের মানুষ বাঙালী। মাতৃভাষা বাংলা। অপরদিকে পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত ছিল সিন্ধী, পশ্তু, বেলুচসহ আরও কয়েকটি ভাষা। এ অবস্থায় পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতৃত্ব উর্দুকে গোটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু করে। অথচ তারও অনেক আগে পূর্ব বাংলায় ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। মায়ের ভাষার প্রতি বাঙালীর অনুভূতি কত তীব্র ছিল তা জানিয়ে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম লিখেছিলেন: যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি…। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই অনুভূতি স্পর্শ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এ অঞ্চলের মানুষকে পেছনে ফেলে রাখার প্রাথমিক ষড়যন্ত্র হিসেবে ভাষার ওপর আঘাত হানে। মায়ের ভাষা বাংলা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সব অনুভূতি তুচ্ছ করে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসতে থাকে শীর্ষ মহল থেকে। এমন ষড়যন্ত্রে হতবাক হয়ে যায় বাংলার মানুষ। বাঙালীর সে সময়ের মনোজগত তুলে ধরে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘মাগো, ওরা বলে/ সবার কথা কেড়ে নেবে।/তোমার কোলে শুয়ে/ গল্প শুনতে দেবে না।/বলো, মা,/ তাই কি হয়?’
এরপরও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে পাকিস্তানের উর্দুপ্রেমীরা। গণচেতনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন নতুন ফর্মুলা দিতে থাকে। এ অবস্থায় আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেছে নিতে হয় বাঙালীকে। ১৯৪৮ সাল এবং ১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তার প্রমাণ। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৫২ সাল। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি রুখতে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। কিন্তু সব ভয় জয় করে রাজপথে নেমে আসে ছাত্ররা। বাংলার দাবি চিরতরে স্তব্ধ করতে মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক, শফিকসহ নাম না জানা অনেকে। গীতিকবির ভাষায় : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালী/তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি…। মায়ের ভাষার জন্য রক্তে ভেসে গিয়েছিল তৎকালীন ঢাকা। শোকাবহ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসেন। স্বজন হারানোর স্মৃতি অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের স্মরণে গড়ে তোলা হয় প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ ফেব্রুয়ারি স্মৃতির মিনার গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। তবে কাজ হয় না কোন। বাঙালীর ভাষার আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
ভাষার অধিকারের পক্ষে লড়ার পাশাপাশি, ঔপনিবেশিক প্রভূত্ব ও শাসন শোষণের বিরুদ্ধে একুশ ছিল বাঙালীর প্রথম প্রতিরোধ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতিসত্তার যে স্ফূরণ ঘটেছিল তা-ই পরবর্তীতে বাঙালীর জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেরণা জোগায়। কোথায় বরকত কোথায় সালাম/ সারা বাংলা কাঁদিয়া মরে/যে রক্তের বানে ইতিহাস হলো লাল/যে মৃত্যুর গানে জীবন জাগে বিশাল/সে জাগে ঘরে ঘরে…। বাংলার প্রতি ঘরে বোনা হয়েছিল একুশের রক্তবীজ। বায়ান্নর সে বীজ থেকে আজকের বাংলাদেশ।
আজ মায়ের ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বানে, একুশের চেতনায় সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথে সারাদেশে পালিত হচ্ছে মহান শহীদ দিবস। সমাজের সব অন্যায় অসাম্য ধর্মান্ধতা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে বাঙালী। গীতিকবির ভাষায়Ñ স্বাধীন এই বাংলা আমার/কোটি প্রাণ শহীদ মিনার/নেবই নেব, নেবই নেব/নেবই নেব আমরা মনের মতো এই দেশ গড়ে…।

আজ শহীদদের স্মরণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। একই সঙ্গে সর্বত্র ওড়ানো হবে শোকের কালো পতাকা।

শেয়ার