ভাষা আন্দোলন সংগ্রামে যশোর

আমিরুল ইসলাম রন্টু

একটা জাতির বহু সংগ্রামী অর্জন থাকে। বাঙালির জাতীয় জীবনেও বহু অর্জন আছে। সেসব মহৎ অর্জনগুলোর মধ্যে ভাষা সংগ্রাম অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন, যা তার জাতীয় অস্তিত্ব, ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান দিকদর্শন। বায়ান্নর অমর একুশের উদ্ভব ঘটেছিল বলে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সার্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সুদীর্ঘ পোড় খাওয়া বাঙালি জাতির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। মহান একুশ বাঙালির শ্রেষ্ঠ অহংকার, আর মহান মুক্তিযুদ্ধ শ্রেষ্ঠতম অহংকার। আমি এখন মহান ভাষা সংগ্রাম যশোর নিয়ে কিছু লিখবো।
১৯৪৮-এ পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা হতে সূচিত বাংলা ভাষার তীব্র আন্দোলন মুহূর্তে গোটা জনপদে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। যশোর সেই রক্তক্ষরা আন্দোলনে মোটেও পিছিয়ে ছিল না তার অতীত সংগ্রামী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। সেই ৪৮-এ পূর্ব বাংলায় মি. জিন্নাহ তার কুখ্যাত ঢাকা ভাষণে মাত্র ৪ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুকে গোটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার পরপরই জেলা শহর যশোরেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামের ঊত্তাল তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। ৫২-তে সে সংগ্রাম তুঙ্গে উঠেছিল এবং ¯েœই ধারাবাহিকতা দীর্ঘকাল চলেছিল-যতদিন না বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃত হবার গৌরব অর্জন করেছিল । অবশ্য সকল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামে যশোরের অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধেও। এখানে আমি যশোরে বাংলা ভাষা আন্দোলন-সংগ্রামের চিত্র (৪৮-৫২) সংক্ষেপে কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ভাষা সংগ্রামের উপর লেখা বইতে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ বদরুদ্দিন ওমরের দেয়া তথ্যে জানা যায়, তৎকালীন স্বনামখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান ‘বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’ ঢাকার মতো যশোরেও ১১ মার্চ ১৯৪৮, ১৪৪ ধারা জারির কথা বলেন । ওইদিন হতে ১৮ মার্চ পর্যন্ত এখানে চরম অরাজক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন, বিহারীরা বিপুল সংখ্যায় লাঠি সোটাসহ যশোর শহরে প্রবেশ করে বাঙালি বিশেষ করে হিন্দুদের উপর চরম নিপীড়ন চালায়। বিশেষ করে রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়। লাঞ্ছিতরা জানমালের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ততার ভয়ে শহর পরিত্যাগ করে অন্যত্র পালিয়ে যায়। অবাঙালি জেলা প্রশাসক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নিপীড়কদের পক্ষ অবলম্বন করেন। ধীরেন দত্ত ২৪ মার্চ তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে যশোরের কাহিনী পাঠ করে শোনান। যে পত্রে অবাঙালি জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে নেবার দাবি করা হয়। খাজা নাজিম উদ্দিন অভিযোগ স্বীকার করেন এবং তদন্ত ও প্রতিকারের আশ্বাস দেন।
আটচল্লিশ হতে-বায়ান্ন-আন্দোলন সংগ্রামে উদ্বেলিত যশোর। এই পাঁচ বছরে বাংলা ভাষার আন্দোলন-সংগ্রামে অনেকেই যশোরে নেতৃত্বের লাইম লাইটে আসেন। আসেন সক্রিয় ভূমিকায়। সে এক সুদীর্ঘ তালিকা-রাজনৈতিক ও সামাজিক- সাংস্কৃতিক বলয়। কলেজ ও স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে ‘৪৮-এ যারা নেতৃত্ব দেন, ভূমিকায় থাকেন, মিছিলে থাকেন, ‘৫২ তে তাদের অনেকেই তা ধরে রাখতে পারেননি। নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভূমিকা গ্রহণকারীরা সামনে চলে আসেন। ‘৪৮-এ রাজনৈতিক নেতৃত্বে যারা ছিলেন, ‘৫২ তে তারা অনেকেই গতিহীন হয়ে পড়েন। হিন্দু নেতৃত্বের অনেকেই পাড়ি জমান পশ্চিমবঙ্গে। স্কুল পর্যায়ের নেতৃত্ব কলেজ পর্যায়ের ভূমিকায় আসেন, কলেজ পর্যায়ে যারা তারা হয় ভার্সিটি, নয় রাজনৈতিক পর্যায়ে চলে আসেন। আবার অনেকে ছাত্রত্ব হারিয়ে ভূমিকা হারা হন। তাছাড়া বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে আন্দোলন- সংগ্রামের নেতৃত্ব ও ভূমিকা পালনের ইতিহাস বিস্তৃত। নেতা -কর্মী ও ভূমিকাধারীদের তালিকাও লম্বা। অবশ্য আমরা এ বিস্তৃত পরিসরে আপাতত বড় বেশি ঢুকব না। আমাদের পদচারণা মূলত ‘৫২ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বিভিন্ন সূত্র-ব্যক্তি মাধ্যম দ্বারা আমরা যেমন তথ্যসমৃদ্ধ হয়েছি, সেই সঙ্গে রয়েছে লেখকের ব্যক্তি সম্পৃক্ততা। অন্যতম ভাষাসৈনিক প্রয়াত অ্যাড. গাজীউল হক জানান, ‘৪৮-এর ১১ মার্চ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যশোর শহরে বাংলা ভাষার প্রশ্নে ছাত্র-জনতার যে প্রচার বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল, তার নেতৃত্ব ছিলেন তৎকালীন এম এম কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্রনেতা মরহুম আলমগীর সিদ্দিকী ও ছাত্রনেত্রী মরহুমা হামিদা রহমান গুপীসহ কেউ কেউ। সেই মিছিলে সেদিন মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ শুধু লাঠি ও বেয়নেট চার্জ এবং কাঁদানো গ্যাস ছোঁড়েনি, গুলিও চালিয়েছিল। পুলিশসহ ব্যাপক ছাত্র- জনতা আঘাতপ্রাপ্ত ও রক্তাক্ত জখম হয়েছিল।
৪৮ হতে ৫৮ পর্যন্ত যশোরের ভাষা আন্দোলন-সংগ্রামের ধারণা দিতে ও বুঝ দৃঢ়বদ্ধ করতে আমি যশোরের বেশ কয়েকজন প্রবীণ অথচ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলা ভাষার আন্দোলন-সংগ্রামে যশোরের সঠিক অবস্থা নির্ণয়ে চেষ্টা চালাই। তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদি আমাকে সিংহভাগ সহায়তা করে। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪৮ হতে ৫২ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে কম বেশি সম্পৃক্ত ছিলেন। নেতৃত্বের ভূমিকায়, মিছিলের কিংবা ওয়াকিবহাল ছিলেন। তারা হলেন ১. মরহুম ইয়াজদান চৌধুরী, ২. মরহুম একরামুল হক (খড়কি), ৩.প্রয়াত বিমল রায় চৌধুরী, ৪. মরহুম শরীফ হোসেন, ৫. অ্যাড.আব্দুল আলী, ৬.মরহুম অ্যাড. এএফএম নুরুদ্দীন, ৭. মরহুম প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, ৮. অ্যাড. কাজী আব্দুস শহীদ লাল, ৯. আব্দর রাজ্জাক বিল্লাহ (পালবাড়ী), ১০. মরহুম নুরুল ইসলাম (সাবেক সমবায় কর্ম কর্তা), ১১. অ্যাড. রমজান আলী।
এদের মধ্যে কারো কারো সংগ্রামী রাজনৈতিক ঐতিহ্য আছে। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও ভাষা আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব এবং ভূমিকা সম্পৃক্তদের যে তালিকা পেয়েছিলাম, তা কাটছাট করে এই নিবন্ধে তুলে ধরলাম। তবে বিষয়টি দীর্ঘ ৬৭/৬৮ বছর আগের হওয়ায় তথ্যে যেমন ঘাটতি থাকতে পারে, তেমন নেতৃত্ব ও ভূমিকা পালনকারীদের তালিকায় কমবেশি বিকৃতি আসাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রদত্ত তালিকার বাইরেও কেউ কেউ রয়ে যেতে পারেন। এ কারণে যে, সে সময় স্থানীয় কোন মিডিয়া ছিল না বললেই চলে, হয়তো আদৌ ছিল না। আবার তথ্য প্রদানকারীদের একজনের বর্ণনা ও দাবির সঙ্গে আরেকজনের বর্ণনা ও দাবির মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষ ভিন্নতা ও গরমিল পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্দোলনের প্রথমদিকে যশোরাঞ্চল ছিল কম্যুনিস্ট প্রভবিত এবং নেতৃত্বে অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু মহল। জানা গেছে ভাষা আন্দেলনের প্রথম পর্যায় হতে যশোরে দুটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। একটি ছিল সর্বদলীয় (রাজনৈতিক) ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। অন্যটি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। যশোরে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের তালিকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তবে শীর্ষ নেতৃত্বে কে কে ছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। অবশ্যই ৪৮ও ৫২-তে শীর্ষ দুপ্রস্থ নেতা ছিলেন। ৪৮ এ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন মরহুম আলমগীর সিদ্দিকী, মরহুমা হামিদা রহমান গুপীসহ কেউ কেউ। তবে ৫২ তে এসে তাঁরা মূলনেতা ছিলেন কিনা, কিংবা অন্যেরা মূল নেতৃত্বে চলে আসেন কিনা, তা বড় বেশি স্পষ্ট নয়। ৪৮ সালে ক্ষমতাসীন মুসলিস লীগের প্রগতিশীল অংশ বাংলা ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। তাঁরাই পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আরো পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ছাত্ররা মুসলিম ছাত্রলীগ, পরবর্তীতে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (ই.পি. এস.ইউ) মুসলিম যুবলীগ, পরবর্তীতে জাতীয় যুবলীগ এবং তমুদ্দুন মজলিনের সঙ্গে যুক্ত হন।
মতবিনিময়ের মাধ্যমে জানা যায়, ১১ মার্চ ১৯৪৮, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে চুড়িপট্টি হতে প্রায় ২০০ ছাত্রের একটি জঙ্গি মিছিল চিত্রা (সাবেক বেঙ্গল টকিজ) মোড় হয়ে কালেক্টরেট ভবন এলাকায় ঢুকে পড়ে। পুরাতন কসবার কাজীপাড়ার বাঘা কলেজ ছাত্রী হামিদা রহমান গুণীর নেতৃত্বে ওড়না ভর্তি ইটের খোয়া নিয়ে কালেক্টরেট ভবনের অভ্যন্তরে অবস্থিত ‘ট্রেজারি’ আক্রমন করে পুলিশের দিকে প্রচন্ডভাবে ইটের খোয়া নিক্ষেপ করে তাদের আহত করে। পুলিশের লাঠিচার্জে ছাত্রনেতা আলগীর সিদ্দিকীসহ বেশকিছু ছাত্র আহত হন। ডা. তপন আহত ছাত্রদের চিকিৎসা দেন। ইটের খোয়া বর্ষণের শিকার হয়ে কুখ্যাত বিহারী দারোগা ফামউদ্দিনসহ ১০-১২ জন পুলিশ আহত হয়। পুলিশ ৫-৭ রাউন্ড বেপরোয়া ফাঁকা গুলি চালালে দড়াটানা মোড়ে তাজ হোটেলের কার্নিশে একটি বিদ্ধ হয়। পুলিশ তাজ হোটেলসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দোকানে ঢুকে দোকান কর্মচারীসহ আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করলে অনেকে আহত হন। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে তাজ হোটেল ও স্টার হোটেলে ঢুকতে গেলে অবাঙালিরা ঢুকতে দেয়নি। ফলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা হোটেল দুটি ভাংচুর করে এবং মিটিং করে সকল অবাঙালি হোটেল বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এম এম কলেজের সামনে অবস্থিত বিহারি হোটেল মালিক আব্দুল জব্বার আন্দোলনকারীদের পক্ষ নিয়ে হোটেল ব্যবসা চালাতে থাকেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ( ডি. এম) এইচ ই নোমানী ছিলেন বিহারি। তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলন বিরোধী ব্যাপক ভূমিকা নেন এবং তার নির্দেশে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সুযোগে পুলিশ ১৮ মার্চ পর্যন্ত চরম নিপীড়ন চালায়।
কারও কারও মতে, ৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি হতে ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে যশোরে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ যে তুঙ্গে উঠে সে সময়ও ছাত্র -জনতার সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। এই দাবির মাধ্যমে পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রশ্নে দুটি দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে, আমাদের ধরে নিতে হবে ‘৪৮ ও ’৫২ উভয় সালে পুলিশ যশোরে ছাত্র -জনতার উভয় মিছিলে গুলিবর্ষণ করেছিল। দীর্ঘকাল পরে দাবির সঠিকতা প্রমাণ করতে যেয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির মুখে আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তবে একবার যে গুলিবর্ষণ হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সকল বিবেচনায় ৪৮-র পাল্লা ভারি হলেও একটি প্রশ্নে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কেননা কৃতি পার্লামেন্টারিয়ান শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক অভিযোগপত্রে ৪৮-এ গুলিবর্ষণের কোনো উল্লেখ নেই। এরপরও ৪৮-এ গুলিবর্ষণের বিষয়টি জোরালো। দাবিটিও অগ্রাহ্য করতে চাইনে। এ প্রশ্নে যথোপযুক্ত ‘রিসার্স’ হলে সত্য বেরিয়ে আসবে এবং ইতিহাস সে সত্য ধারণ করবে।
৪৮হতে ৫২ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী যশোর শহরে যেসব ছাত্র-ছাত্রী কলেজ ও স্কুল পর্যায়ে নেতৃত্বে ভূমিকায় কিংবা বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন-তাদের তালিকা বিশাল, মফঃস্বল মিলাতে গেলে সে তালিকা সুবিশাল। বিশেষকরে সে সময় ছিল বৃহওর জেলা- নড়াইল, মাগুরা, ঝিনেদা ও সদর মহকুমা সমন্বয়ে। সদর মহকুমা আজ ৮ থানা বিশিষ্ট হাল যশোর জেলা। এটা মিলাতে গেলে সে তালিকা সেদিনের ভাষা আন্দোলন-সংগ্রামরত নেতাকর্মীর সংখ্যার ব্যাপকতা হবে। আমি এখানে কেবল যশোর জেলা বিশেষ করে যশোর শহর সম্পৃক্ত নেতৃত্বের তালিকা দিতে প্রয়াস নিলাম। অবশ্য ৪৮ হতে ৫২ মিলিয়েই। তারা হলেন মরহুম আলমগীর সিদ্দিকী, মরহুমা হামিদা রহমান গুপী, মরহুম শেখ আমানুল্লাহ(কলারোয়া), মরহুম সৈয়দ আফজাল হোসেন, মরহুম ইয়াজদান চৌধুরী, মরহুম তৌফিকুল ইসলাম, মরহুম নূরুল ইসলাম দত্ত, মরহুম আমির আহমেদ, মরহুম আমীর হোসেন মাখন, মরহুম রেজা খান, মরহুম আফসার আহম্মদ সিদ্দিকী, মরহুম আজিজ খান, শহিদ আবুল কাসেম খান, দ্রেবব্রত চ্যাটার্জী, রণজিৎ মিত্র(পশ্চিমবঙ্গ), সুলতানুজ্জামান (সাবেক ডিসি), মরহুম অ্যাড.জিন্নাহ, প্রয়াত বিমল রায় চৌধুরী, সুবোধ রায় (পশ্চিম বাংলা), ওসমান গণি (চৌগাছা),আবু বক্কর খান, হায়বাতউল্লাহ জোর্য়াদ্দর, মরহুম সামসুল আলম খান, (কালিগঞ্জ), বরুন কুমার ধর(পশ্চিমবঙ্গ), মরহুম এসএ গজনবী, শহিদ কাজী অলিউর রহমান, শ্রীমতি কৃষ্ণা ধর (পশ্চিমবঙ্গ), মরহুম হাবিবুর রহমান (খোলাডাঙ্গা), নাজমা বেগম, জিয়াউল হক, মহীদুল ইসলাম, মরহুম ওয়াজিউল্লাহ, মরহুম প্রিন্সঃ আব্দুর হাই, মরহুম কামরুজ্জামান (সাবেগ সংসদ সদস্য,ঝিনেদা), মরহুম একরামুল হক (খড়কি), মরহুম কাজী আব্দুর রাকিব (অব.লে.কর্ণেল), মরহুম সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন, মরহুম নূরুল হক(পলিয়ানপুর) কেষ্ট মজুমদার (পশ্চিমবঙ্গ), মরহুম আব্দুর রাজ্জাক খান, মরহুম আফজাল সিদ্দিকী, মরহুম আব্দর রউফ, মরহুম অ্যাড.এফএম নুরুদ্দীন, লায়ন অ্যাড. তহিদুর রহমান, মরহুম মিনারুল হক, মরহুম হায়দার আলী, মরহুম মাহমুদ হোসেন, মরহুম আব্দুর সাত্তার (চুড়িপট্টি),মরহুম সিরাজুল ইসলাম (চুড়িপট্টি), মরহুম মাহমুদুল হক, মরহুম মোরশেদ শাহানা , মরহুম শেখ আব্দুর রশিদ(চুড়িপট্টি), মরহুম ডা. মাহমুদ কবির, মরহুম আব্দুল মতিন, অ্যাড.কাজী আব্দুস শহিদ লাল, আব্দুর রাজ্জাক বিল্লাহ, মরহুম এলাহী বকস্সহ অনেকে।
সেদিন (‘৪৮,‘৫২) যারা যশোরে বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পৃষ্টপোষকতা দানের নেতৃত্বে ছিলেন তারা হলেন প্রয়াত ডা.জীবন রতন ধর(প্রাক্তন মন্ত্রী,পশ্চিমবঙ্গ), মরহুম আবুল খায়ের(পীর সাহেব,খড়কী), মরহুম অ্যাড. হাবিবুর রহমান, শহীদ অ্যাড.মশিউর রহমান, মরহুম অ্যাড. আব্দুল খালেক, মরহুম কম.আব্দুল হক, মরহুম অ্যাড.মোশারফ হোসেন খান, মরহুম অ্যাড.রওশন আলী, মরহুম অধ্যক্ষ আব্দুল হাই, প্রয়াত ডা.লোলিত মোহন মুখাজী, প্রয়াত কবি অবলাকান্থ মজুমদার, মরহুম আবুল কাশেম(বনগাঁ), মরহুম রবিউল ইসলাম(বনগাঁ), গোলাম মোর্শেদ, মরহুম আনোয়ারুল ইকবাল(ফকির মিয়া), মরহুম মনসুর আহাম্মেদ, মরহুম আহম্মদ আলী বিশ্বাস, শহীদ শেখ আবু তালেব, প্রয়াত সতীশ কুমার দত্ত সহ আরো কেউ কেউ।
সংস্কৃতি পরিমন্ডলে ছিলেন প্রয়াত গায়ক হায়দার আলী, প্রয়াত গায়ক অজিত দত্ত, প্রয়াত গায়ক মোহাম্মদ ইয়াসীন, প্রয়াত গায়ক মনিরজ্জামান, নাট্যকর্মী শহিদ অমল সোম, প্রয়াত আবুল হাসেম, প্রয়াত সৈয়দ সিদ্দিকি হোসেন, প্রয়াত মহমুদুল হকসহ অনেকে। সেই সময় সকল মহকুমা ও থানা হেড কোয়ার্টারে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। নেতৃত্বে এসেছিলেন প্রগতিশীল ছাত্র নেতৃত্ব। সহযোগিতায় এসেছিলেন প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাংলা ভাষা শুধু রাষ্ট্রভাষা হয়নি, আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে, জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের স্মরণের মণিকোঠ হতে সেই সকল ভাষা শহিদ, ভাষা বীর, সেদিনের ঘটনাপঞ্জি যেন বিস্তৃতির অতলে তলিয়ে না যায় -না যায় হারিয়ে।

লেখক : ভাষা মিছিলে অংশ গ্রহণকারী, রাজনীতিক, কলামিস্ট।

শেয়ার