গৃহবধূ সেলিনা হত্যার রহস্য উদঘাটন
বেল্লালকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়ার প্রস্তুতি যশোর সিআইডি’র

লাবুয়াল হক রিপন ॥ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এবং ধর্ষণ শেষে বিয়ে না করে সটকে পড়ার চেষ্টা করে কাঠ মিস্ত্রি বেল্লাল হোসেন। এ সময় সেলিনা তাকে আটকে ফেলেন এবং বিয়ে না করে যেতে দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। এক পর্যায়ে বেল্লাল হোসেন সেলিনা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যায়। মামলার তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। যে কারণে বেল্লাল হোসেনকেই অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন যশোর সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জাকির হোসেন। এই মামলায় আটক ইলিয়াস হোসেন ও রমজান আলীকে অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করা হবে।
জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের কেফায়েত নগর গ্রামের আনসার আলীর স্ত্রী সেলিনা বেগম বছর কয়েক আগে স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। দুইটি ছেলে ও মেয়ে নিয়ে পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করতেন সেলিনা। কাপড়ের ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন লোকের বিয়ের মধ্যস্থতা বা ঘটকালি করতেন তিনি। সে কারণে পরিচয়র হয় খুলনার ফুলতলা উপজেলার ধোপাখোলা গ্রামের মোহাম্মদ মোল্যার ছেলে বেল্লাল হোসেনের সাথে। বেল্লাল হোসেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের বুলবুলের বাড়ির ভাড়াটে।
২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পরে সেলিনার বাড়িতে আসেন বেল্লাল। এসময় তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বেল্লাল শারীরিক সম্পর্ক করেন। এরপর রাত ৯টার দিকে বেল্লাল হোসেন সটেক পড়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বিয়ে করা ছাড়া বেল্লাল হোসেনকে বাড়িতে যেতে বাধা দেন সেলিনা বেগম। দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায় সেলিনার পরনে থাকা শাড়ির আঁচল দিয়ে তার গলায় শ্বাসরোধে হত্যা করে বেল্লাল। পরে রাতেই পালিয়ে চলে যায়। সূত্রমতে, বেল্লাল হোসেন চলে যাওয়ার সময় সেলিনার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায়। ওই মোবাইলটি বেল্লালের ভাগ্নে আরিফুল ইসলামকে ব্যবহার করতে দেয়।
এরই মধ্যে সেলিনা হত্যার পর তার ছেলে সোহেল রানা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন বসুন্দিয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই জাফর আহম্মেদ অভয়নগর থেকে ইলিয়াস হোসেন ও রমজান আলীকে আটক করেন। এরপরই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জাকির হোসেন। বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেলিনার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি আরিফুল ইসলাম নামে এক যুবককের কাছ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। আরিফুল পুলিশতে জানায়, তার মামা বেল্লাল হোসেন তাকে মোবাইলটি দিয়েছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর বেল্লালকে আটক করে। ২২ সেপ্টেম্বর সেলিনার সাথে বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক এবং হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় বেল্লাল হোসেন।
জবানবন্দিতে বেল্লাল হোসেন স্বীকার করেন, ছোট বেলা থেকে তিনি কাঠ মিস্ত্রির কাজ করেন। প্রথমে তিনি অভয়নগরের দেয়াপাড়া গ্রামে জরিনা নামে একজনকে বিয়ে করেন। ৪/৫ বছর পর পারিবারিক বিরোধে জরিনা তাকে তালাক দেন। এরপর যশোর সদর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে শরিফা খাতুন নামে আরেকজনকে বিয়ে করেন। সেখানে ১৬/১৭ বছর সংসার করার পরে শরিফা স্ট্রোক করে মারা যান। সেই ঘরে দুইটি মেয়ে আছে। এরপর আবারও বিয়ে করার জন্য বেল্লাল হোসেন ঘটকের মাধ্যমে মেয়ে দেখছিলেন। অন্য এক ঘটকের মাধ্যমে সেলিনা বেগমের সাথে পরিচয়। সেলিনার সাথে তার মাঝে মাঝে মোবাইলে কথা হতো। ঘটনার দিন ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বেল্লালকে তার বাড়িতে আসতে বলে সেলিনা। সন্ধ্যার পরে সেলিনার বাড়িতে এসে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাদের দুইজনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়। এরপর বেল্লাল বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেলিনাকে বিয়ে না করে যেতে দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। এনিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায় সেলিনাকে ধাক্কা দেয় বেল্লাল। সেলিনা ঘরের দরজার পাশে পরে ইটে মাথা লেগে কেটে যায়। এসময় সেলিনার গলায় শাড়ি পেচানো ছিল। বেল্লাল সেই শাড়ি টেনে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর সেলিনার মোবাইল নিয়ে বেল্লাল হোসেন পালিয়ে চলে যান।
তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেলিনা হত্যাকাণ্ডে বেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে বেল্লাল হোসেনকে অভিযুক্ত এবং ইতিপূর্বে আটক অপর দুইজনের অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে।

শেয়ার